হীরে আর ব্যাজ্ঞের গল্প

0
30
হীরে আর ব্যাঙের গল্প
হীরে আর ব্যাঙের গল্প

আসসালামু আলাইকুম। আমার প্রিয় পাঠক বৃন্দরা আপনারা সবাই কেমন আছেন? আশা করি আল্লাহর রহমতে সবাই ভালো আছেন। আজ আমি আপনাদের কে একটি শিক্ষনীয় গল্প বলবো। আর সেই গল্পের আমি নাম দিয়েছি হীরে আর ব্যাঙের গল্প। চলো বন্ধুরা শুরু করা যাক, হীরে আর ব্যাজ্ঞের গল্প।

হীরে আর ব্যাজ্ঞের গল্প

বহুকাল আগে এক গ্রামে এক জেলে আর তার বউ বাস করতো। তাদের দুজনের একটা সুন্দর ফুট ফুটে মেয়ে বাচ্চা ছিল। যার নাম ছিল জেরি। জেলে প্রতিদিন নদীতে মাছ ধরতে যেত। সারা দিন মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করে যা লাভ হত তা তার বউ কে দিয়ে দিত। তার এই সামান্য রোজগার দিয়ে দিন চলে যেত।

হঠাৎ একদিন জেলে নদীতে দেখতে পেল পানিতে একটা খাচার মধ্যে ছোট বাচ্চা ভেসে আসছে। জেলে ভাবল, এই ছোট বাচ্চাটা এখানে কিভাবে নদীতে আসলো। আর কোন মা এই বাচ্চাটিকে নদীতে ভাসিয়ে দিল। আর কোন চিন্তা না করে তার চেয়ে ভালো বাচ্চাটিকে  তুলে নেই। তা নাহলে বাচ্চাটি পানিতে ডুবে যাবে।

তারপর জেলে বাচ্চাটিকে আস্তে করে কোলে তুলে নিল। জেলে সে দিন আর মাছ না ধরে বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে বাড়িতে চলে গেল। জেলে বাড়িতে গিয়ে বউকে বলল, এই যে দেখ নদীর পানিতে মেয়েটি ভেসে এসেছে। আমি ওকে সেখান থেকে তুলে নিয়ে এসেছি। জেলের কথা শুনে তার বউ বলল, আমাদের একটা মেয়ে আছে আর একটা মেয়ে নিয়ে কি করবো। তখন জেলে তার বউ কে বোঝালো।

তারপর দুজনে মিলে মেয়েটির নাম রাখলো জারা। জেলে পানিতে ভেসে আসা জারা কে নিজের মেয়ের মতই ভালবাসত। দিনে দিনে জেরি আর জারা বড় হতে লাগলো। দুজনেই ছিল অনেক সুন্দর। জেরি হয়েছে তার মায়ের মত আর জারা হয়েছে তার বাবার মত দেখতে।

হঠাৎ এক সময় জেলে খুব অসুস্থ হয়ে গেল। আর কিছু দিন পর জেলে মারা গেল। জারা অনেক কাঁদতে লাগলো। জেরির মা জারা কে বলল, তোমার জন্য আজ আমাদের এই অবস্থা। তুমি একটা অলক্ষী মেয়ে। তোমার মুখ দেখাটাও আমাদের পাপ।

জারার প্রতি তার মায়ের রাগ দিন দিন বারতেই লাগলো। জেলের বউ জারার সাথে সবসময় কাজের মেয়ের মত ব্যবহার করতো। জারা কে কখনো পরিবারের সদস্য বলে মনেকরত না। সারা দিন কাজ করত আর রান্না ঘরে বসে একা একা কাদতো। জারা ঘরের কাজ ছাড়াও দিনে দুবার করে ঝরর্না থেকে পানি আনতে যেতে।

জারার ব্যবহারে পরীর পুরুষ্কার

ঝরর্না বাড়ী থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে। একদিন সেখান থেকে পানি আনতে গিয়ে। সেখানে বসে বসে কাদতেছিল জারা। আর সেদিন এক গরীব মহিলা সেখান দিয়ে হাটতে ছিল। তিনি দেখতে পেলেন এক সুন্দর মেয়ে বসে কাদছে। মহিলাটি বললেন, তুমি কি আমাকে একটু পানি দেবে।

আমার অনেক পিপাসা লেগেছে মা। তখন জারা বলল, হ্যা দিচ্ছি কেন পানি দেব না। জারা সেখান থেকে উঠে চোখের পানি মুছে ঘরায় করে পানি নিয়ে ঐ মহিলাটিকে ঢেলে দিল যাতে তার পানি খেতে সহজ হয়।

মহিলাটি পানি খাওয়ার পর জারা কে বলল, তুমি যে রকম সুন্দর সে রকম তোমার ব্যবহার। তাই তোমাকে একটা পুরুষ্কার দিতেই হবে। মহিলাটি বলল, যখন তোমার মন যা চাইবে তা চোখ দিয়ে পানি হয়ে বের হবে। আর তা হয়ে যাবে সোনা, হীরা, মুক্তা। কেননা সেই মহিলাটি ছিলেন একজন পরী।

তিনি যখনি দুই হাত এক জায়গায় করলেন। ঠিক তখনি একজন পরীতে পরিনত হয়ে আকাশে উড়ে গেলেন। জারা তখন অবাক হয়ে গেল। সে সাথে সাথে মাটিতে বসে পরলো। আর তখনি পরী হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।

জারা বাড়ীতে ফিরে দেখে তার মা রেগে আগুন। জেরির মা বলল,তোমার পানি আনতে এতক্ষন লাগে। তুমি জাননা আমাদের অনেক খিদা লেগেছে। যাও আর আমাদের জন্য খাবার তৈরী করো। এখনে চলে যাও। জারা বলল, ঠিক আছে মা আমি যাচ্ছি। আর আপনাদের জন্য খাবার নিয়ে আসছি।

জারা রান্না ঘরে ঢুকে মনে কষ্ট নিয়ে কাদতেছিল। যখনি কাদতেছিল তখন তার চোখের পানি পরীর কথা মত সোনা, হীরা, মুক্তা হয়ে ঝরতে লাগলো। ঠিক তখনি জেরির মা রান্না ঘরে ঢুকলো। দেখে জারার চোখের পানি সোনা, হীরে মুক্তা হয়ে ঝরছে। জেলের বউ তা দেখে অবাক হয়ে গেল।

তখন তার মা জারা কে বলল, তোমার চোখ দিয়ে সোনা, হীরে, মুক্তা বের হচ্ছে। আর এটা কিভাবে সম্ভব। এখনি তুমি আমাকে বলো। জারা তখন তার মাকে সেই দিনে ঝরনার ধারে পরীর সাথে কি হয়েছিল সব তার মার কাছে বলে দিল। জারার মা তা শুনে অবাক হয়ে গেল।

জেরির ব্যবহারে পরীর অভিশাপ

তারপর তিনি তার বড় মেয়ে জেরি কে ডাকলো। জেরির মা জেরি কে বলল, তুমি এখনি ঐ ঝরনার কাছে যাও আর ওখানে যদি কোন বুড়ো মহিলা আসে। আর সে যদি তোমার কাছ থেকে পানি চায়। তুমি তাকে আদবের সহিত ভাল ব্যবহার দেখিয়ে পানি খেতে দিবে। আর খুশি হয়ে তিনি তোমাকে আর্শিবাদ করবে। আর তোমার যত ইচ্ছে হীরে আর সোনা পাবে। তার মার কথা শুনে জেরি চলে গেল।

জেরি ঐ ঝরনার কাছে চলে গেল বাড়ির সব চাইতে সুন্দর কলসটা নিয়ে। আর যখন সে ঝরনার পানি থেকে পানি ভরতে লাগলো। ঠিক তখনি একটা মহিলা সুন্দর পোশাক পরে তার কাছে  চলে আসলো। মহিলাটি তার কাছে এসে পানি খেতে চাইলো।

তখন জেরি সেই মহিলাটি কে বলল, আমি কি আপনার জন্য কলসে পানি ভরে রেখেছি। আমি আপনাকে পানি খেতে দিব না। আমি তো ওনাকে পানি দেওয়ার জন্য এই কলস বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছি। আপনাকে পানি দেব কেন।

এই কথা শুনে ঐ মহিলাটি বলল, তুমি তো খুব অভদ্র। ঠিক আছে তুমি যখন এতই অভদ্র আর কৃপন। তাই তোমাকে আমি অভিশাপ দিয়ে গেলাম। তুমি যখনি কথা বলতে যাবে তখনি তোমার গলা দিয়ে ব্যাঙের আওয়াজ বের হতে থাকবে। এই কথা বলেই মহিলাটি সেখান থেকে চলে গেল।

জেরি তাকে থামানোর চেষ্টা করলো কিন্তু ব্যাঙের মত শব্দ বের হতে লাগলো। জেরি কাদতে লাগলো আর ব্যাঙের মত আওয়াজ করতে থাকলো। জেরি ব্যাঙের মত আওয়াজ করতে করতে বাড়ি চলে গেল।

জেরি বাড়িতে চলে গেলে তার মা, জেরি কে বলল, তোমার কি হয়েছে। জেরি বলতে চাইলো। কিন্তু তার মুখ থেকে শুধু ব্যাঙের আওয়াজ বের হতে লাগলো। জেরির মা ভাবলো আমার মেয়েকে মনেহয় ঐমহিলাটি অভিশাপ দিয়েছে। ক্ষমা কর ঈশ্বর।

তখন জেরির মা জারা কে বলল,তোমার জন্য আজ আমার মেয়ের এই অবস্থা। আমি তোমাকে ছাড়বো না। এর হিসাব একদিন তোমাকে দিতে হবে। আর এখন যাও আর জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে নিয়ে আসো। আমার মেয়ের খুব খিদে লেগেছে। জারা তখন খুব কাদতে লাগলো।

জারার অসহায় জীবন

কাদতে কাদতে বাড়ির বাহিরে চলে গেল। আর রাস্তায় হীরে মুক্ত ছরিয়ে পরতে লাগলো। পরের দিন সকাল বেলা জারা মনের দুঃখে গান গাইতে লাগলো।

আজ দিনটা আমার সুন্দর হয় যেন, মিষ্টি দিন হয় যেন,
সব দুঃখ ভুলে কষ্ট ভুলে দিনটা সুন্দর হয় যেন।

হঠাৎ সে দিন ঐ রাস্তা দিয়ে এক রাজকুমার ঘোড়ায় চরে যাচ্ছিল। রাজকুমার দূর থেকে তাকে দেখতে পারলো। কিন্তু রাজকুমার তাকে ভালভাবে দেখতে পারল না। রাজকুমার তার মিষ্টি গলার গান শুনে তার প্রেমে পরে গেল। জারা তখন বাড়িতে চলে গেল। কিন্তু জারা বুঝতে পারলো না যে রাজকুমার তাকে দেখতে পেরেছে। আর এদিকে রাজকুমার তাকে না দেখে থাকতে পারলো না। আর তখনি রাজকুমার গেল তাদের বাড়িতে।

বাড়ীতে গিয়ে জারার মার সাথে দেখা হল রাজকুমারের। তিনি বললেন কি জন্য এসেছেন। তখন রাজকুমার বলল, আমি এখনি খামারের পাশে একটি মেয়ে কে দেখেছি। কি মিষ্টি তার গানের গলা। আর আমি তার প্রেমে পরেছি। মেয়েটি কে, তখন জারার মা বলল, ও আমার মেয়ে। আমি এখনি ওকে নিয়ে আসছি।

বাড়ীর ভিতরে গিয়ে তিনি জেরিকে ডাকলেন। তিনি জেরি কে জারার পোশাক পরতে বললেন। আর বললেন, বাহিরে একজন রাজকুমার এসেছে তোমাকে দেখার জন্য। জেরির মা তখন তাকে বাহিরে পাঠিয়ে দিল। রাজকুমার জেরি কে দেখে বলল, কি সুন্দর তুমি, কি মিষ্টি তোমার গানের গলা, তুমি আমার মন ভুলিয়ে দিয়েছো।

আর আমি তোমাকে আমার রানী করতে চাই। আমি আরো খুশি হবো। তুমি যদি আমাকে আর একবার গান শোনাও। যাতে তোমার গানের আওয়াজ আমার এই শংখে ভরে নিয়ে যেতে পারি। আর আমি আমার মাকে তোমার গান শোনাতে পারি। আর তিনি তোমার গান শুনে আমাদের বিয়েতে রাজি হন।

রাজকুমারের কথা শুনে জেরি গান গাইতে চেষ্টা করল। কিন্তু তার গলা দিয়ে শুধু ব্যাঙের আওয়াজ বের হতে লাগলো। ব্যাঙের আওয়াজ শুনে রাজকুমার রেগে গেলেন আর বললেন, এটা কি ধরনের মজা হচ্ছে। আমাকে অপমান করা হচ্ছে। রাজকুমার তখন পৌহরি কে ডাকলেন আর মেয়েটিকে নিয়ে যেতে বললেন।

রাজকুমারের সাথে দেখা

ঠিক তখনি বাড়ী থেকে জারা বের হয়ে আসলো। আর রাজকুমার কে বললেন, আমার বোন কে ক্ষমা করে দিন। ওকে অভিশাপ দিয়েছে ও যদি কখনো কথা বলতে চায়, ওর গলা দিয়ে শুধু ব্যাঙের আওয়াজ বের হয়ে যায়। আরর আমি এই খামারের পাশে দাঁড়িয়ে গান বলেছিলাম।

রাজকুমার তখন জারা কে দেখে অবাক হয়ে গেল। রাজকুমার ভাবলেন আমাকে আবার বোকা বানানো হচ্ছে না তো। তিনি এবার জারা কে গান গাইতে বললেন, আর জারা রাজকুমার কে গান শোনালেন। রাজকুমার তার গলার গান শুনে মুগ্ধ হয়ে গেল। রাজকুমার তখন জারাকে বলল, তোমার গলা ঠিক তোমার মত সুন্দর। আর তোমার গলাই পরিচয় দিচ্ছে তোমার মন অনেক সুন্দর। আর আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি তোমাকে আমার রানী বানাবো।

তখন জারা রাজকুমার কে বলল, আমাকে ক্ষমা করবেন। কারন আমার বোন রাজকুমার কে বিয়ে করতে চায়। রাজকুমার রেগে গেলেন আর বললেন আমি একজন মিথ্যুক ব্যাঙ কে বিয়ে করতে পারবো না। জারা তখন ঐ মায়াবি পরী কে ডাকলো আর বলল, আমাকে সাহায্য করুন। আমার আর্শিবাদ আমার বোন কে দিন আর ওর অভিশাপ আমাকে দিন।

আমি ওর অভিশাপ নিতে রাজি। তবুও আমার বোন কে ভাল করে দাও। আর ওর মনের আশা পূরন করে দাও। জারার ভালবাসা দেখে জেরি তার ছোট বোন কে জরিয়ে ধরলো আর দুজনে কাদতে থাকলো। ঠিক তখনি ঐ পরী তাদের সামনে চলে আসলো। পরী তখন হীরে আর ব্যাজ্ঞের গল্প টি সবাই কে বলল। আর জেরিকে তার কর্মের জন্য দোষারোপ করলো।

জেরির অভিশাপ থেকে মুক্তি

পরী বলল, আমি ভাবছি তুমি উচিত শিক্ষা পেয়েছো। আমি তোমার অভিশাপ তুলে নিলাম। আর তুমি এখন কথা বলতে চাইলে সুমধুর কন্ঠে কথা বলতে পারবে। পরী তখন তার যাদু দন্ড ঘুরালো আর সাথে সাথে তার গলা ঠিক হয়ে গেল। তখন জেরি পরীকে ধন্যবাদ জানালো। আর পরী যাদুদন্ড ঘুরিয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।

আর তখন রাজকুমার জারার দয়ালু আর ভালবাসা দেখে বিয়ে করতে চাইলো। আর বলল, তোমার ছোট বোন কে আমার ছোট ভাইয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে দেব। জারা রাজকুমারের কথায় রাজি হয়ে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিল। খুব ধুম ধাম করে দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেল। পুরো রাজ্যের মানুষ কে আমন্ত্রন জানানো হলো। শুধুমাত্র  তাদের মা কে বাদ দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হলো।

এক বছর পর তাদের ঘরে সুন্দর রাজপুত্রের জন্ম হয়েছে। সারা রাজ্যে আনন্দে মেতে উঠেছে। জারা তার মেয়েকে কোলে নিল। প্রথমবার যখন তার মেয়ে কাদলো। তার মেয়ের চোখের পানি হীরা,মুক্তা হয়ে ঝরতে লাগলো। আর দয়া আবারও জিতে গেল।