লোভী চশমাওয়ালা ডাক্তারের গল্প

0
30
লোভী চশমাওয়ালা ডাক্তারের গল্প
লোভী চশমাওয়ালা ডাক্তারের গল্প

আসসালামু আলাইকুম। বন্ধুরা সবাই কেমন আছেন? আশা করি ভালই আছেন। আজকে আমি আপনাদের একটি শিক্ষণীয় রুপকথার গল্প বলবো। গল্পটির নাম দিয়েছি লোভী চশমাওয়ালা ডাক্তারের গল্প। আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে। চলুন শুরু করা যাক আজকের লোভী চশমাওয়ালা ডাক্তারের গল্প টি।

একজন লোভী চশমাওয়ালা ডাক্তারের গল্প

এক সময় এক ডাক্তার ছিল নাম রাজন চাঁদ। সে চোখের ডাক্তারি করতো। সে ডাক্তার হওয়া সত্ত্বেও তার লোভ ছিল প্রচুর। ভিজিটের থেকে বেশি টাকা কিভাবে নেয়া যায় এদিক এ তার লক্ষ্য ছিল বেশি। গরিবের থেকেও সে বেশি বেশি টাকা নিতো। বিভিন্ন ফন্দি এটে সে মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিতো। ধরা পরার ভয়ে সে এক জায়গায় বেশি দিন তার চেম্বার রাখতো না। বিভিন্ন জায়গায় সে চেম্বার খুলে বিভিন্ন জালিয়াতি করতো। তার এক চেলা ছিল। নাম ছিল তার নান্নু। এবার তারা শহরে একটি চেম্বার খুললো।

ডাক্তারঃ কিরে নান্নু সবকিছু ঠিক ঠাক ভাবে গুছিয়েছিস তো? নতুন শহর! কিছু দিন আমাদের লোক ঠকানো ভালই চলবে মনে হয়।
নান্নুঃ ও আপনি ভাববেন না ডাক্তার বাবু। আমি সব গুছিয়ে রেখেছি। আর এসব আমার বা হাতের খেলা। এত দিন ধরে একই কাজ করছি কোন চিন্তা নেই। হিহিহিহি(হাসলো)
ডাক্তারঃ তা অবশ্য ঠিক। চোখ দেখাতে এসে চোখের সামনে পকেট খালি হয়ে যায় কিন্তু কেউ কিছু বুজতেই পারে না। হাহাহাহা
নান্নুঃ আপনি ভিতরে গিয়ে বসুন ডাক্তারবাবু কখন আবার রোগী এসে যায় বলা যায় না।
ডাক্তারঃ বেশ বেশ তা ঠিক বলেছো।

কিছুক্ষণ পর একজন মহিলা রোগী আসলো।

ডাক্তারঃ কত দিন ধরে দেখতে অসুবিধা হচ্ছে আপনার?
রোগীঃ বেশ কদিন ধরেই ডাক্তার বাবু। রাতের বেলা সমস্যা আরো বেশি হয়।
ডাক্তারঃ হুম। এখন আপনার চোখে একটু ঔষধ লাগিয়ে দেবো একটু জ্বালা করবে। কিন্তু ভয়ের কোন কারণ নেই একটু পর ঠিক হয়ে যাবে।
রোগীঃ আচ্ছা ডাক্তার বাবু।

ডাক্তার ঔষধ লাগিয়ে দিলো। রোগী চোখে কিছু দেখছে না।
ডাক্তারঃ এই নান্নু এবার ওনাকে ধরে নিয়ে পাশের রুম এ নিয়ে যাও। ওখানে বসতে দে ওনাকে।
নান্নুঃ আসুন দিদি আমার সাথে, এই যে আমি। আসুন আসুন। কথা বলতেই রোগীর ব্যাগ থেকে টাকার থলিটা বের করে নিল নান্নু।

লোভী ডাক্তার ও রোগী

ডাক্তারঃ এখন চোখ খুলে দেখুন কিছু দেখতে পাচ্ছেন কিনা ।
রোগীঃ হ্যা ডাক্তার বাবু এখন সব কিছু আগের মত পরিস্কার দেখতে পাচ্ছি।
ডাক্তারঃ হ্যা বেশ, তা এখন আমার ভিজিট টা দিয়ে আপনি আসতে পারেন।
রোগীঃ একি আমার টাকা গেলো কোথায়?
নান্নুঃ কি হয়েছে দিদি টাকা আনতে ভুলে গেছেন?
রোগীঃ তাই বোধ হয়। টাকা তো আমার ব্যাগে নেই। কিন্তু এখন কিভাবে ডাক্তার বাবুর ভিজিট দেবো?
ডাক্তারঃ ওসব নিয়ে ভাববেন না। ভুল তো মানুষেরই হয়।
রোগীঃ তা ঠিক কিন্তু আপনার ভিজিট?
ডাক্তারঃ আহা এত চিন্তা করবেন না। আমার এ্যাসিস্টেন্ট না হয় আপনার বাড়ি গিয়ে টাকাটা নিয়ে আসবে।
রোগীঃ অনেক ধন্যবাদ ডাক্তার বাবু।

নান্নু রোগির বাড়িতে যায় টাকা আনতে। সেখানে গিয়ে দেখে টেবিলের উপর একটা দামি হাত ঘড়ি। সেটাও সে চুরি করে পকেটে নিয়ে নেয়। এরপর ভিজিটের টাকা দিতে রোগী বলে অনেক বড় উপকার করলেন ভাই। নান্নু মনেমনে বলে উপকার তো হলই কিন্তু সেটা আমাদের লাভ বেশি হলো।

কিছুদিন পর এক লোক আসে তাদের চেম্বারে। হাতে একটা টাকার ব্যাগ।

লোকঃ ও ভাই আপনাদের এখানে কি দামি চশমা পাওয়া যাবে?
নান্নুঃ হ্যা নিশ্চই পাওয়া যাবে। সব থেকে ভাল চশমা পাওয়া যাবে। আপনি দাড়ান আমি এক্ষুণি দেখাচ্ছি।
লোকঃ বেশ বেশ ও ভাই তাহলে একটু দেখান। যাতে পরার পর চোখে যেন কোন অসুবিধা না হয়। ঠিক আছে?
নান্নুঃ ঠিক আছে। এ নিয়ে আপনি কোন চিন্তাই করবেন না। আপনি চশমা পছন্দ করার পর ডাক্তার বাবু তা পরিক্ষা করে আপনার চোখের পাওয়ার এর সাথে এক করে দিবেন। এতে আপনার চোখের কোন সমস্যাই হবে না।
লোকঃ আরে তাই নাকি। এমন একটা দোকান তো আমি খুজছিলাম।
নান্নুঃ স্যার আপনার হাতের ঐ ব্যাগটা ওখানে রেখে এখানে এসে চশমা পছন্দ করুন।
লোকঃ আরে না। ব্যাগে আমার অনেক টাকা আছে। ব্যাংকে জমা করতে যাচ্ছি। এটা বাইরে রাখা যাবে না। আমার সাথেই থাক।
নান্নুঃ হুম এটাই তো জানার ছিল(মনেমনে)। ঠিক আছে স্যার আমিই তাহলে আপনার কাছে এসে চশমা দেখাচ্ছি।

চশমা দেখার পর যখন পছন্দ হলো

লোকঃ এইটা থাক। এটাই বেশ পছন্দ হয়েছে।
নান্নুঃ ঠিক আছে আপনি এখানে বসুন। আমি ডাক্তার বাবুর কাছ থেকে চশমার পাওয়ার টা জেনে আসছি। (এই বলে পছন্দ করা চশমা টা নিয়ে ডাক্তারের চেম্বারে নান্নু গেলো। চশমায় কিছু একটা মেখে লোকটিকে চশমাটা দিলো। লোকটা চশমা চোখে দিয়ে কিছুক্ষণ হাটতেই লোকটি অজ্ঞান হয়ে গেলো। যেই না লোকটা অজ্ঞান হয়েছে তখনি নান্নু পিছন থেকে এসে লোকটার টাকা ওয়ালা ব্যাগ নিয়ে উধাও। তার পর নান্নু টাকার ব্যাগ নিয়ে চেম্মবারে আসে।
ডাক্তারঃ বাহ মন্দ নয়(টাকা দেখার পর)
নান্নুঃ হ্যা স্যার। নতুন জায়গায় এ কয়দিন যা ব্যাবসা হয়েছে না তার থেকে অনেক বেশি একটা দান মেরেছি।
ডাক্তারঃ হুম বুঝলাম। কিন্তু এক জায়গায় তো আর বেশি দিন থাকা যাবে না।
নান্নুঃ হ্যা ডাক্তার বাবু। এরকম আর কয়টা মুরগি ধরতে পারলেই এখান থেকে সব গুটিয়ে অন্য জায়গায় পাড়ি দিতে হবে।
ডাক্তারঃ এবার এসব লুকিয়ে ফেল দেখি রোগী আসার সময় হয়ে গেছে।
নান্নুঃ আরে ও স্যার একটা কথা বলতে তো ভুলেই গেছি। এখাকার সব থেকে বড় ধনী বিপিন বাবু নাকি চোখ এ এর সমস্যায় ভুগছেন। তার চোখ নাকি প্রায় অন্ধ। তিনি নাকি একজন ভালো চোখের ডাক্তার খুজছেন। কেউ যদি তার চোখ একমাসের মধ্যে ঠিক করে দিতে পারে তাহলে তাকে তিনি পাঁচ লক্ষ্য টাকা পুরস্কার দিবেন।
ডাক্তারঃ বলিস কি পাঁচ লক্ষ্য টাকা !
নান্নুঃ হ্যা স্যার। যাবেন নাকি একবার ওখানে? যদি চোখটা ভাল করতে পারেন।
ডাক্তারঃ যাই, দেখি একবার চেষ্টা করে।

বিপিন বাবুর বাড়িতে গেলো দুজন। বিশাল বাড়ি চারদিকে অনেক দামি দামি জিনিস পত্রের ছড়াছড়ি। তারা ভাবছে এই জিনিস গুলো সরাতে পারলেই আর ভিজিট বা পুরস্কারের দরকার হবে না। নান্নু বলে তা সব প্লান করা যাবে এখন আগে রোগিকে দেখে নেই। পাঁচ লক্ষ টাকাও তো আর কম না।

লোভী ডাক্তার ও রোগীর শর্ত

ডাক্তারঃ নমস্কার বিপিন বাবু।
বিপিনঃ নমস্কার। আপনি কি সেই রাজন। সেই বিখ্যাত চোখের ডাক্তার।
ডাক্তারঃ আজ্ঞে হ্যা।
বিপিনঃ দেখো ডাক্তার আমি যে একে বারে দেখতে পাই না এটা না। তবে ধীরে ধীরে আমার দৃষ্টি শক্তি কমে যাচ্ছে। দিন দিন আবছা দেখছি। তাই আমি আমার আগের মত দৃষ্টিশপক্তি ফিরে পেতে চাই।
ডাক্তারঃ আমি আপনার আগের মত দৃষ্টিশক্তি ফেরাতে আপ্রাণ চেষ্টা করবো বিপিন বাবু।
বিপিনঃ আমার দেয়া শর্তের কথা আপনি হয়তো জেনেই এসেছেন নাকি বলতে হবে?
ডাক্তারঃ না আমরা জেনেই এসেছি। এক মাসের মধ্যেই ঠিক করতে পারলেই আমরা আমাদের পুরস্কার পাবো।
বিপিনঃ ঠিক আছে কিন্তু ওটা অর্ধেক শর্ত। যদি একমাসের মধ্যে আমার চোখ ঠিক না হয় তাহলে আমাকে দশ লক্ষ টাকা ক্ষতি পূরন দিতে হবে।
ডাক্তারঃ একি বলেন কি?
বিপিনঃ হ্যা এটাই আমার শর্ত। এই শর্তে কি আপনি রাজি?
ডাক্তারঃ একটু চিন্তা করেই বললো বেশ বেশ আমি রাজি। তাহলে আগামী কাল থেকেই আমি আমার চিকিৎসা শুরু করবো।

এর পর ডাক্তার রাজন আর তার চেলা নান্নু বিপিন বাবুর বাড়ি এসে থাকতে শুরু করলো। তাদের থাকার সব ব্যবস্থা করে দিলেন বিপিন বাবু। চোখের উপর পট্টি বেধে শুরু হলো তার চিকিৎসা। কিন্তু লোভী ডাক্তার ও তার চেলা বিপিন বাবুর বাড়ির দামি জিনিস দেখে লোভ সামলাতে পারলো না। বাড়ীর চাকর রতন কে কিছু টাকা দিয়ে তার মুখ বন্ধ করে দিল যেন সে কোন কিছু দেখেও না বলে তার মালিককে। প্রতিদিন তারা একটা দুটা করে দামি জিনিস সরাতে থাকলো। ধীরে ধীরে শর্তের সময় শেষ হয়ে আসলো। বিপিন বাবু ডাক্তারকে বলে –

বিপিনঃ ডাক্তার আর মাত্র তিন দিন বাকি। মনে আছে তো শর্তের কথা?
ডাক্তারঃ আমার ডাক্তারি অভিজ্ঞতা বলছে আপনি আপনার দৃষ্টিশক্তি ঠিকি ফিরে পাবেন। আর আমিও পাবো আমার পাঁচ লক্ষ টাকা পুরস্কার।
বিপিনঃ সে হলে তো ভালই। আর না হলে আপনাকে কিন্তু ক্ষতির পরিমান দশ লক্ষ টাকা জরমানা দিতে হবে।
ডাক্তারঃ ঠিক আছে। আগামী কালই আপনার চোখ খুলে দেবো।

লোভী ডাক্তারের পাপের ফল

পরের দিন, চোখ খোলার পর ডাক্তার বলে হয়ে গেছে। এবার আপনি আপনার চোখ আস্তে আস্তে খুলুন তো। তবে খুব সাবধান।

বিপিনঃ না না ডাক্তার ভালো বুঝতেছি না। মনে হচ্ছে আপনাকে আপনার দশ লক্ষ টাকা দিতে হবে।
ডাক্তারঃ মিথ্যে এ হতেই পারে না। আপনি আবার ভাল করে দেখুন। আমার ডাক্তারি অভিজ্ঞতা বলছে আপনি ঠিকি দৃষ্টি শক্তি ফিরে পেয়েছেন।
বিপিনঃ নাহ আমি সম্পুর্ন দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাই নি।

এই বিবাদের অবসান ঘটাতে কোর্ট এর সাহায্য নিতে হল। তারা সবাই কোর্ট এ গেলো। জজ সাহেব আসলেন।

জর্জঃ ওর্ডার ওর্ডার। আপনারা সকলে চুপ করুন। আমি আগে ডাক্তার এর কথা শুনতে চাই। আপনি বলুন।
ডাক্তারঃ ধর্ম কর্তা আমি আমার সমস্ত ডাক্তারি এবং তার ব্যাখ্যা দিয়ে প্রমান করে দিয়েছি যে বিপিন বাবু তার দৃষ্টশক্তি ফিরে পেয়েছেন। উনি সব কিছুই দেখতে পাচ্ছেন। কিন্তু শর্তের পাঁচ লক্ষ টাকা না দেয়ার জন্য উনি বলতেছেন যে উনি দেখতে পাচ্ছেন না। এ তো প্রতারণা হুজুর।
জর্জঃ বেশ এ তো ডাক্তারের কথা বোঝা গেলো। এবারে অভিযুক্ত বিপিন বাবুর কথা শোনা যাক।
বিপিনঃ হুজুর আমি কখনোই বলি নি যে আমি অন্ধ হয়ে গেছি। আমি বলেছি দৃষ্টি শক্তি কমে যাচ্ছে, আমি যেন আগের মত ভাল দেখতে পারি। কিন্তু কই আমি তো সেই আবছাই দেখছি।
জর্জঃ আপনি খুলে বলুন বিপিন বাবু।
বিপিনঃ চিকিৎসার আগে আমি সব কিছু আবঝা আবঝা দেখতে পেতাম। কিন্তু সময় শেষে আমি ঘর বাড়ী দেখতে পাচ্ছি কিন্তু আমার ঘরে রাখা দামি জিনিস পত্র আর দেখছি না। তাহলে আমি কি করে বলি যে আমি ভালো হয়ে গেছি।
জর্জঃ বুঝেছি। হটাৎ আপনার বাড়ির দামি জিনিস পত্র চুরি হয়ে গেছে। তা আপনার চিকিৎসা চলা কালিন সময় কে কে আপনার বাড়িতে ছিল?
বিপিনঃ ডাক্তার, তার কর্মী আর আমার চাকর রতন।
জর্জঃ আপনার বাড়ি দেখভাল করার দ্বায়িত্ব রতন এর। সে যখন চুপ করে আছে। তাহলে রতনই এই চুরি করেছে। তার জন্য এই আদালত তাকে ২০ বছরের জন্য হাজত বাস নির্দেশ দিচ্ছে।

লোভী ডাক্তারের শাস্তি

রতনঃ কান্না স্বরে বললো, আমি কিছু করিনি সাহেব আমি কিছু করিনি। আমি তো বারন করেছিলাম। আমাকে টাকার লোভ দেখিয়ে ডাক্তার বাবু সব কিছু চুরি করে নিয়ে গেছে। আমি একটা জিনিস ও নেই নি। সব জিনিস ডাক্তার বাবুর বাড়িতেই আছে। আমাকে হাজতে দিবেন না। হাজত আমার খুব ভয় লাগে।

এর পর লোভি ডাক্তার আর তার চেলা নান্নু কে ধরে ২০ বছরের সাজা আর জরিমানা করা হয়। এজন্যই বলা হয় অতি লোভে তাতি নষ্ট। তাই আপনাদের কারো যেন এই লোভী চশমাওয়ালা ডাক্তারের গল্প এর মত না হয়।