লাল জুতার গল্প

0
39
লাল জুতার গল্প
লাল জুতার গল্প

আসসালামু আলাইকুম বন্ধুরা। আপনারা সবাই কেমন আছেন? আশা করি ভালই আছেন। আজকে আমি আপনাদের একটি রুপকথার গল্প বলবো। গল্পটির নাম লাল জুতার গল্প। আশা করি রুপকথার লাল জুতার গল্প টি আপনাদের ভালো লাগবে। আর কথা না বাড়িয়ে চলুন রুপকথার লাল জুতা এর গল্প টি শুরু করা যাক।

লাল জুতার গল্প

রুপা নামের একটি মেয়ে তার মায়ের সাথে, ছোট্ট একটি গ্রামে বাস করত। রুপা ও তার মা একটা কুড়ে ঘরে থাকতো। রুপারা খুব গরিব ছিল। রুপার পড়ার মত কোন জুতা ছিল না। সে খালি পায়ে ঘুরে বেড়াত। রুপার মা এরকম দেখে তাকে কাঠের জুতা তৈরী করে দেয়। সে সব সময়ই এখন কাঠের জুতা পড়ে বেড়ায়। জুতা গুলো শক্ত হওয়ায় তার পায়ে ব্যাথা লাগতো।

হঠাৎ একদিন রুপার মা অসুস্থ হয়ে পড়লো। রুপা তার মায়ের খেয়াল রাখছিল। সে তার মাকে খাওয়াতো, মাথা টিপে দিতো আর বাড়ির কাজ করত। একদিন বাড়ি ফেরার সময় রুপা একটি কাঠের বাক্স দেখতে পেলো। সেই বাক্সের মধ্যে ছিল একজোড়া লাল জুতা। বাক্সটা রাস্তার ধারে পড়ে ছিল। জুতা জোড়া দেখে রুপার খুব পছন্দ হইয়ে যায়। তাই রুপা বাক্সটি জুতা সহকারে বাসায় নিয়ে যায়।

বাসায় নিয়ে গেলে তার মা সেটা দেখতে পায়। কিন্তু এই জুতা নেয়ায় রুপার মা মোটেও খুশি হন নি। তিনি রুপাকে বলে, দেখ রুপা রাস্তার ধারে পড়ে থাকা জিনিসে হাত দেয়া ঠিক না। এটা হয়তো অন্য কারোর। এটাকে চুরি বলে। কেউ হয়তো তার লাল জুতা খুজে বেড়াচ্ছে। রুপা বলে, তাদের আরো বেশী সাবধান হওয়া উচিত ছিল মা, যেই এই জুতা পাবে সেই এই জুতা রাখবে। রুপার মা বললো, আহ রুপা এত জেদ করতে নেই সোনা।

আমরা গরিব এজন্য হয়তো আমি তোমাকে জুতা কিনে দিতে পারি না। কিন্তু তাই বলে আমাদের কখনো ভুল করা উচিত না। কথা দাও আমাকে, তুমি কখনো এই লাল জুতা জোড়া পড়বে না। এ কথা শুনে রুপার মন খারাপ হয়ে গেলো। কিন্তু ও ওর মাকে খুব ভালোবাসে তাই তার মাকেও কষ্ট দিতে পারে না। সে তার মাকে বলল, আমি কখনো এই লাল জুতা জোড়া পড়বো না।

সময় চলে যায় কিন্তু রুপা ওই লাল জুতার কথা কিছুতেই ভুলতে পারে না। সে নিজে নিজে বলে, মা ঠিক বুঝতে পারছে। এই জুতার কারো দরকার নেই। এজন্যই তো এগুলো রাস্তার ধারে ফেলে রেখে গেছে। কিছু দিন পর রুপার মা অসুস্থতার কারণে মারা যায়। রুপা খুব কষ্ট পায় তার মা চলে যাওয়াতে।

সে খুব ভেঙ্গে পড়ে। রুপা একটা অদ্ভুত কাজ করে। সে তার মায়ের শেষ ক্রিয়ার দিন ঐ লাল জুতা জোড়া পড়ে যায়। সবাই খুব অবাক হয়। সবাই রুপার পায়ের দিকে লক্ষ করেছিল। কিন্তু রুপার এতে কোন ভ্রুক্ষেপ ছিল না, জুতাটা ওর খুব ই পছন্দের ছিল।

ঠিক তখনি এক বৃদ্ধা তার নিজের গাড়িতে করে ঐ পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। উনি খুব দয়ালু ছিলেন। তিনি নামলেন এবং যখন জানতে পারলেন যে, একটা ছোট্ট মেয়ে অনাথ হয়ে গেছে তখন উনি রুপাকে দত্তক নেবার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি রুপাকে বলেন, ও আমার সোনা মন খারাপ করো না। আমি আছি তো তোমার সাথে, তুমি একা নও। এখন থেকে তুমি আমার সাথে আমার বাড়িতে থাকবে আর খাবে। খুব ভালো ভাবে পড়া শুনা করে খুব নাম করবে।

এসব বলতেই তার চোখ লাল জুতার দিকে গেলো। আর বললো, আরে তোমার পায়ে এটা কি? তোমার মায়ের শেষ ক্রিয়ার দিন কেন এই লাল জুতা পড়েছো। খুলে ফেলো এগুলো। খুব বাজে লাগছে এগুলো। রুপা বললো, না আমি খুলবো না, এগুলো আমার।

ভদ্র মহিলা তাকে বলে, দেখো সোনা আজকে এরকম জেদ করতে নেই। আমি এর থেকে ভালো জুতা কিনে দেবো। বৃদ্ধা জোর করে রুপার পা থেকে লাল জুতা জোড়া খোলালো। লাল জুতা খোলার জন্য রুপার মন খারাপ হয়ে গেলো।

এরপর বৃদ্ধা রুপাকে নিয়ে গেলো তার বাড়িতে। বৃদ্ধার নিজের কোন সন্তান ছিল না। রুপাকে তিনি তার নিজের মেয়ের মতই দেখতেন। রুপার জন্য আলাদা একটা ঘর দিলেন। রুপার জন্য কিছু জামা আর একজোড়া জুতা কিনে দিলেন। কিন্তু জুতা জোড়া ছিল নিল রঙের।

রুপার লাল জুতো খুব পছন্দের ছিল। সে সব সময় ঐ লাল জুতার কথা ভাবতো। সে নিজে নিজে বলে, কেন যে আমাকে আমার ওই লাল জুতা পড়তে দিচ্ছে না। একদিন আমি ওটা পড়বই কেউ আমাকে আটকাতে পারবে না।

সময় চলে যায়, রুপাও বড় হয়ে ওঠে। সে এখন এক সুন্দরি যুবতি। কিন্তু ওর বেড়ে ওঠার সাথে সাথে ওর জেদ ও বাড়তে থাকে। ওর জেদ সামলানো খুব মুশকিল হয়ে যায়। একদিন সকালে বৃদ্ধা সুন্দর নাশতা বানালেন আর রুপার সামনে দিতেই সে বলে ওঠে, আমি এসব খাবো না আমি ভাত খাবো।

বৃদ্ধা রুপাকে বলে, খেয়ে দেখো খুব ভালো লাগবে আর আমি আজকে ভাত রান্না করিনি। তোমার জন্য এই সুন্দর নাশতা করেছি। রুপা বললো, নাহ আমি এসব খাবো না। তার থেকে ভালো আমি না খেয়েই থাকবো। বৃদ্ধা রুপাকে এতটাই ভালোবাসেন যে, তিনি চাননি যে রুপা না খায়েই থাক। তাই তিনি বাধ্য হয়ে আবার কষ্ট করে ভাত রান্না করেন।

এভাবে সময়ের সাথে সাথে রুপার সব জামা কাপড় ছোট হয়ে যায়। জুতাও ছোট হয়ে যায়। বৃদ্ধা বুঝে যান যে, রুপাকে নতুন জামা আর জুতা কিনে দেয়ার সময় এসে গেছে। জুতা কেনার জন্য এক দোকানে ঢুকতেই রুপার চোখে পরলো এক জোড়া লাল জুতা। রুপা আনন্দে বলে উঠলো, আহ এটা তো আমার সেই ছোটবেলার সেই জুতাটার মতই।

আর রুপা বললো আমি এটাই নিবো। বৃদ্ধা বিরক্তি স্বরে বলে, ওহ আবার সেই লাল জুতা। সব সময় পড়ার মত একটা জুতা কেনো যাতে সব খানেই যাওয়া যায়। এই লাল জুতা পড়ে তো আর শেষ ক্রিয়ায় যেতে পারবে না। সেটা অসম্মানের হবে।

আর আমার কাছে এত টাকা নেই। এখন যে তোমাকে দুই জোড়া জুতা কিনে দেবো। আমার পায়ে ব্যাথা করছে আমি হাটতে পারছি না। কিন্তু লাল জুতা টা দেখে রুপা এতটাই খুশি হয়েছিল। যে সে কোন কথাই শুনছিলো না।

রুপা আবার বলে, আমি কিছু জানি না আমার এটাই পছন্দ আর আমার এটাই চাই। তুমি যদি না কিনে দাও তাহলে আমি বাকিটা জীবন খালি পায়ে হাটবো। বৃদ্ধা বলে, এত জেদ করো না সোনা এর ফল একদিন ভোগ করতে হবে। কিন্তু রুপা কোন কথা শুনলো না।

বৃদ্ধা তাকে সেই লাল জুতা কিনে দিলো। তিনি সাথে আরো একজোড়া ভালো দেখে জুতা কিনলেন রুপার জন্য। বৃদ্ধার কাছে আর কোন টাকা ছিল না তাই তাদের হেটে বাড়ি যেতে হল। সারাটা রাস্তা বৃদ্ধা খুব কষ্ট করে হেটে বাসায় আসলেন। কিন্তু রুপা তার জুতা কেনার আনন্দে নাচছিল। বৃদ্ধার পায়ের ব্যাথা ভ্রুক্ষেপ না করেই। সে নেচে গেয়ে আনন্দে আত্বহারা হয়ে গিয়েছিল।

পরের দিন বৃদ্ধার এক শ্রাদ্ধ বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল। বৃদ্ধা রুপাকে বলে, আজকে আমাদের একটা শ্রাদ্ধ বাড়িতে যেতে হবে কিন্তু তুমি ঐ লাল জুতাটা পড়বে না। সেটা অসম্মানের হবে। রুপা কথা মত ঘরে গেলো আর সে একবার লাল জুতার দিকে দেখলো আর একবার কালো জুতার দিকে। শেষ মেশ সে লাল জুতাটা বেছে নিলো।

সে লাল জুতাটা তার পড়নের জামা দিয়ে ঢেকে নিলো যাতে বৃদ্ধা সেই লাল জুতাটা দেখতে না পায়। তারা ঐ অনুষ্ঠানে পৌছিল। কিন্তু সেখানে সবাই রুপার পায়ের দিকে দেখছিলো। আর সবাই এটা নিয়ে আলোচনা করছিলো যে, সে কিনা মৃত ব্যক্তিকেও সম্মান করে না। এই ঘটনাটা এক ভদ্রলোক বৃদ্ধাকে বললেন। বৃদ্ধা এবার খুব রেগে গেলেন। তিনি রুপার হাত ধরে ওখান থেকে বেড়িয়ে এলেন।

বৃদ্ধা রুপাকে বলল, তোমার এত জেদ কিসের তোমাকে বারন করা সত্ত্বেও তুমি এই লাল জুতা টা পড়েছো কেন!  তুমি কোন কথা শোন না? রুপা বলে, কিন্তু এটা তো আমার জুতা আমি যেখানে খুশি সেখানে পড়ে যাবো। একজন বয়স্ক সৈনিক ওখান দিয়ে যেতে পুরো ঘটনাটি দেখলেন।

তিনি রুপার কাছে এসে হাটু গেরে জুতার কাছে কিছু একটা ফিস ফিস করে বললেন। তিনি বললেন, তোমার মালকিনের মত জেদি থাকো আর খুব ভালো মত নাচ করো। তার পর উনি রুপার জুতায় হাত বুলিয়ে দিলেন। তখন রুপা বললো, অহ স্যার আপনি এটা কি করছেন? সৈনিক বললো আরে আমি তো তোমার সুন্দর নাচের লাল জুতাটার প্রশংসা করছি। তুমি খুব ভালো নাচ পারো বুঝি।

রুপা খুব খুশী হলো আর সে ওনাকে দেখাতে চাইলো। যে সে খুব ভালো নাচ পারে। সে নাচতে শুরু করলো সেই সৈনিক কে দেখানোর জন্য। নাচ শেষে থামতে চাইলে সে থামতে পারলো না। সে বললো আমার নাচ বন্ধ হচ্ছে না কেন। আমার পা থামছে না কেন? আমার সাথে এটা কি হচ্ছে? বৃদ্ধা তাকে বললো, ওহ রুপা কি করছো এটা ফিরে এসো। কিন্তু রুপা গাড়ি থেকে অনেক দূরে সরে গেছে নাচতে নাচতে। লাল জুতাটা আর ওর কথা শুনছিলো না। জুতাও ছিল বেশ জেদি।

জুতা গুলো রুপাকে জঙ্গল আর পাহাড়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলো। জুতা গুলো নেচেই চলেছে, রুপার পা এবার ব্যাথা শুরু করেছে। নাচতে নাচতে ওড় পিঠেও ব্যথা হচ্ছিলো, ও খেতে বা ঘুমাতেও পারছিলো না। ওর বিছানার কথা মনে পড়ছিলো আর সেই বৃদ্ধার। কিন্তু জুতা গুলো থামছিলো না।

দিন রাত ও নেচেই যাচ্ছিলো। সে বলতে লাগলো কেউ আমাকে বাঁচাও আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আমি খুব ক্লান্ত হয়ে পরেছি। কিন্তু কেউ ওকে সাহায্য করতে আসে না। এবার রুপা ভয় পাচ্ছিলো। জুতা গুলো রুপাকে কাটা যুক্ত জঙ্গলে নিয়ে যাচ্ছিলো। এবার রুপার পায়ে বাজে ভাবে ফোস্কা পড়েছিলো।

অবশেষে সে লাল জুতা খুলতে সক্ষম হলো। কিন্তু পায়ের অবস্থা এত খারাপ ছিল যে, সে লাঠি ছাড়া উঠে দাড়াতে পারছিলো না। এত কিছুর পরও লাল জুতা গুলো নেচেই চলেছে। রুপায় পায়ে প্রচন্ড ব্যথা হচ্ছিলো। সে কোন রকমে লাঠিতে ভর করে বাড়ি ফেরে। সাথে সাথে সেই লাল জুতা গুলোও নাচতে নাচতে তার সাথেই চলতে থাকে। বৃদ্ধা রুপাকে দেখে খুব খুশী হন।

পরের দিন রুপা দোকানে যাবার জন্য বের হলো। কিন্তু দরজা খুলতেই সে দেখলো দরজার বাইরে সেই লাল জুতা গুলো নেচেই চলেছে। আর রুপাকে বাড়ি থেকে বের হতে বাধা দিচ্ছিলো।। রুপা আর বৃদ্ধা দুজনেই চমকে গেছিলো। রুপা তার ভুল বুঝতে পেরে বৃদ্ধাকে বলে আমার এতটা জেদ করা ঠিক হয়নি আমাকে ক্ষমা করে দাও। এই লাল জুতার মতই আমিও জেদ করতাম। আর এখন আমি বাড়ি থেকে বের হতে পারছি না। ভাল লাগছে না আমার।

বৃদ্ধা বলে, ও সোনা তুমি বরং প্রার্থনা করো যেন এই জুতা গুলো চলে যায়। তোমার ব্যবহারে যদি তুমি সত্যি অনুতপ্ত হয়ে থাকো তাহলে তোমার প্রার্থনা কাজে আসবে। রুপা প্রার্থনা করতে লাগলো। যখন সে চোখ খুললো তখন সে দেখলো সেই সৈনিক যে কিনা তার নাচের প্রশংসা করেছিলো।

রুপা অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল। সৈনিক বললো, মা আমি খুব খুশি হয়েছি যে, তুমি নিজের ভুল বুজতে পেরেছো। তুমি যেমন তোমার জেদ ত্যাগ করেছো তেমনি তোমার ঐ লাল জুতা গুলোও জেদ ত্যাগ করেছে। এই কথা গুলো বলে বৃদ্ধ সৈনিক উধাও হয়ে যায় আর ওই লাল জুতা গুলোও।

রুপা সিদ্ধান্ত নেয় সে খুব ভালো করে পড়াশুনা করবে আর লাল জুতা কখনোই পড়বে না। এরপর রুপা আর বৃদ্ধা খুব খুশিতে দিন কাটাচ্ছিলো। তাই বন্ধুরা, আপনারা কেউ বেশি জেদ করবেন না। তাহলে কিন্তু এর ফল একদিন পেতেই হবে। লাল জুতার গল্প থেকে আপনারা সবাই তা জানতে পেয়েছি। আমি মনেকরি, এই লাল জুতার শিক্ষনীয় গল্প থেকে আমাদের সবার শিক্ষা নেওয়া উচিত।