ভালবাসার কবজ

0
32
ভালবাসার কবজ
ভালবাসার কবজ

আসসালামু আলাইকুম। আমার প্রিয় পাঠক বৃন্দ আপনারা সবাই কেমন আছেন? আশা করি আল্লাহর রহমতে সবাই ভালো আছেন। আজ আমি আপনাদের কে একটি ভালবাসার মজার গল্প বলবো। আর যে গল্পটি আপনাদের জানাবো তার নাম দিয়েছি, ভালবাসার কবজ যা একটু সুখের জন্য দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়ানো।

ভালবাসার কবজ

বহুকাল আগে এক রাজ্যে রাজা আর রানী ছিল। তাদের কিছুদিন হল বিয়ে হয়েছে। তারা একে অপরকে খুব ভালবাসে। আর তারা ছিল অনেক সুখি। রাজার নাম ছিল হিরন আর রানীর নাম ছিল জারা। তারা চাইত তাদের সুখ যেন সারা জীবন থাকে। তাদের ইচ্ছে ছিল। তাদের যেন একটা ভালবাসার কবজ থাকে। আর তা দিয়ে তাদের বিবাহিত জীবনের সব বিপদ দূরে রাখবে।

একদিন রাজার সেনাপতি তাকে বলল, রাজা মশাই আমাদের রাজ্যের জংগলে একজন সাধু আছে। তাকে সবাই মান্য করে, বিপদ আপদে মানুষ তার কাছে যায় পরামর্শের জন্য। তখন রাজা সেনাপতি কে বললেন, তাহলে এখনি তার সাথে আমাদের দেখা করা উচিত। পরের দিন রাজা রানী ঐ লোকটির সাথে দেখা করার জন্য জংগলে গেলেন।

যখন তারা লোকটার কাছে গেলেন তারপর তারা তাদের মনের সব কথা বললেন। তখন ঐ বুদ্ধিমান লোকটি বলল, রাজা মশাই আপনারা পৃথিবীর যে কোন দেশে যান। যে দেশে আপনি সুখি মানুষ দেখবেন। তাদের পরনের কাপড় থেকে কিছু অংশ আমার কাছে নিয়ে আসবেন। আমি সেই অংশ গলন্ত সোনা দিয়ে আপনাদের আংটি বানিয়ে দেব। আর সেটা হবে আপনাদের  ভালবাসার কবজ। আর এটাই হচ্ছে আপনাদের একমাত্র উপায়।

ভালবাসার কবজ গল্প এর প্রথম সুখি পরিবার

তারপর রাজা রানী লোকটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিল। তারা দুজনে বহু বন জঙ্গল পারি দিয়ে অবশেষে শহরে এসে পরলো। তারা এক পথিক কে বলল, এই শহরে সব থেকে সুখি ব্যক্তি কে। পথিক বলল, হ্যা আমাদের জমিদার আর তার রানী এই শহরের সব থেকে বেশি সুখি মানুষ।

তখন রানী রাজাকে বলল, এখনি আমাদের তার কাছে যেতে হবে। তারপর তারা ঐ রাজা রানীর কাছে চলে গেল। সেখানে গিয়ে তারা রাজা রানী কে বলল, আপনারা এই শহরের সব থেকে বেশি সুখি। রাজা রানী বলল, হ্যা আমরা এই শহরের সব থেকে বেশি সুখি।

তখন হিরন আর জারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকলো। রাজা বলল, আমাদের একটা সমস্যা আছে। রাজা হিরন বলল, আপনাদের কি সমস্যা। রাজা বলল, আমাদের একটাই সমস্যা সেটা হল আমাদের কোন সন্তান নেই। আমরা প্রতিদিন ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি যেন আমাদের একটা সন্তান হয়। তাহলে আমরা আরও সুখি হতাম।

এ কথা শুনে রাজা হিরন আর জারার মন খারাপ হয়ে গেল। কারন ঐ সাদু লোক টি যা বলেছিল তা তারা পেল না। তারা হতাশ হয়ে মন খারাপ করে সেই শহর থেকে চলে গেল।

সেখান থেকে চলে এসে তারা সুখি পরিবার খোজার জন্য বেরিয়ে পরলো। বহু রাস্তাঘাট পেরিয়ে তারা এক দেশে গিয়ে পৌছিল। সেখানে গিয়ে তারা এক সুখি ব্যক্তির দেখা পেল। তারা নাকি সুখে শান্তিতে জীবন যাপন করছে। তাই তারা সেই সুখি পরিবারের কাছে গিয়ে বলল, আসলে কি তারা সুখি। তারা বলল, হ্যা আমরা সুখি।

ভালবাসার কবজ গল্প এর দ্বিতীয় সুখি পরিবার

আমাদের মাঝে অনেক মিল। তবে আমাদের ছেলেটা যদি অসুস্থ না হত তাহলে আমরা আরো বেশি সুখি হতাম। আমরা এদেশের বড় ডাক্তার কে দেখেও তার কোন সুস্থতা আনতে পারি নাই। তাদের এসব কথা শুনে রাজা হিরন আর জারা হতাশ হয়ে গেলেন।

তারা বলল, আপনার সন্তানের কথা শুনে আমাদের মনটা খারাপ হয়ে গেল। দোয়া করি আপনাদের সন্তান তারাতারি সুস্থ হোক আর আপনাদের পরিবারে সুখ ফিরে আসুক। আর আমরা আমাদের সুখি পরিবারের সন্ধান চালিয়ে যাব। তারা সেই পরিবার কে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে আসলো।

তারা বহু দেশ ঘুরল সুখি পরিবারের খোজে। তারা এমন কোন সুখি পরিবার কে খুজে পেল না। রাজা হিরন বলল, আমরা জানি অবশ্যই আমাদের ভালবাসার কবজ আমরা খুজে পাব। রানী জারা বলল, ঠিক যেন তাই হয়। আমাদের এত সব কস্ট যেন বৃথা না হয়। তখন রাজা হিরন তার রানীকে হাসি মুখে শান্তনা দিল। কিন্তু রাজা হিরন ও ছিলেন অনেক চিন্তিত।

ভালবাসার কবজ গল্প এর তৃতীয় সুখি পরিবার

হঠাৎ একদিন মাঠের প্রান্তর দিয়ে যাওয়ার সময় তারা রাস্তার পাশে ছাগলের রাখাল কে দেখতে পায়। সেই রাখাল মনের সুখে বাঁশি বাজাচ্ছে। ঠিক তখনি এক মহিলা একটি শিশু ও কোলে এক বাচ্চা নিয়ে তার কাছে এল। যখনি ঐ লোকটি তাদের কে দেখল তার কোল থেকে বাচ্চা টাকে নিয়ে মুখে চুমু খেল।

লোকটার কুকুর শিশুটির কাছে গেল আর ঘেউঘেউ করতে লাগলো। মহিলাটি সাথে করে আনা খাবার পাটিতে সাজিয়ে রাখলো। আর রাখাল আরাম আয়েস করে খেতে লাগল। রাজা হিরন আর রানী জারা তা দেখল, তারা দুজনে তাদের কাছে আসলো

রানী জারা তাদের কে বলল, আমার মনেহয় আপনারা সব থেকে সুখি স্বামী স্ত্রী। রাখাল বলল, তা ঠিক আছে। আমরা অনেক সুখি। রাজা হিরন বলল, তা কি রকম সুখি আপনারা। তখন রাখাল বলল, রাজা রানীও আমাদের থেকে বেশি সুখি নয়। আমরা শুধু সুখি নই আমরা আমাদের জীবন নিয়ে অনেক সন্তুষ্ট।

তখন রাজা হিরন আর রানী জারা দুজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিল। তারা ভাবল, অবশষে সুখি স্বামী স্ত্রীর খোজ পেয়েছি। তারা বলল, আপনাদের সাথে কথা বলতে পেরে আমরা অনেক আনন্দিত। রাখাল বলল, আমরাও ধন্য হতাম যদি আপনারা আমাদের সাথে বসে কিছু খাওয়া দাওয়া করতেন।

যদিও সামান্য তবুও খাওয়া দাওয়া করা যেতে পারে। রাজা রানী তাদের মাথা নাড়ল আর বলল, হ্যা আমরা এক সাথে খাবার খেতে পারি।তারপর রাজা রানী তাদের সাথে বসে এক সাথে খাবার খেল।

বিভিন্ন আলাপ আলোচনার মধ্যে দিয়ে খাবার শেষ করলো। তারপর রাজা আর রানী ভাবল তাদের কাছে এখন একটু সুতি কাপড়ের টুকরো চাইতে হবে। আমরা সত্যি খুব ভাল খেলাম। আপনারা আমাদের অনেক উপকার করেছেন। আর আপনাদের কাছে আমরা আর একটা উপকার চাই।

কিন্তু আমি আগেই বলছি উপকার করে আপনারা আবার আফসোস করবেন না। তখন রাখাল বলল, ঠিক আছে বলুন। তারপর রাজা বলল, আপনাদের পরনের কাপড়ের কিছু অংশ আমাদের দেবেন আর আমি তার বদলে আপনাদের কিছু উপহার দেব। রাখাল বলল কি উপকার করতে পারি।

তৃতীর সুখি পরিবারের কাছ থেকে না পেয়ে

রানী বলল, আমরা অনেক দিন থেকে সুখি স্বামী স্ত্রী খুজে চলেছি। আর আমরা আপনাদের খুজে পেয়েছি। আপনারা যদি আপনাদের পরনের কাপড়ের টুকরো আমাদের দেন তাহলে আমরা জংগলে ঐ সাধু লোকটির কাছে যাব, আর তা দিয়ে আমরা একটি সুখি ভালবাসার কবজ বানিয়ে নেব।

আর সেই ভালবাসার কবজ নিয়ে সারা জীবন আমরা সুখে থাকবো। ঠিক আপনারা যে রকম সুখি আছেন। তখন রাখাল তার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইল। তাদের কে দেখে রাজা রানী চিন্তায় পরলো। তারপর রাখাল বলল, আমরা আমাদের জামার এক টুকরো কেন জামার পুরুটা আপনাদের দিয়ে দিতে পারতাম।

কোন সমস্যা ছিল না। কিন্তু আমাদের কাছে তা নেই। যা আছে তাই নিয়ে আমরা সুখি। তাদের কথা শুনে রাজা রানীর মন ভেংগে গেল। তারা হতাশ হয়ে গেল। তারা চলে আসার আগে ঐ পরিবার কে কিছু উপহার দিয়ে আসলো। রাজা রানী বলল, আপনি একজন ভাল মানুষ। তাই আপনি এবং আপনার পরিবারের দিকে খেয়াল রাখবেন। রাখাল বলল, আপনাদের ধন্যবাদ।

তারা দুজনে ঘোড়ার পিঠে উঠে একে অপরের দিকে তাকালো। রাজা তার রানী কে বলল, আমরা মনেহয় কখনো এই সুখি ভালবাসার কবজ পাব না। আর এই কবজের জন্য আমরা আমাদের পুরু যৌবনটাকে নষ্ট করে ফেলছি। তখন রানী বলল, আমারও তাই মনেহয় তার চাইতে আমরা আমাদের রাজ্যে চলে যাই।

আর আমাদের কোন ভালবাসার কবজের দরকার নেই। তারপর তারা চিন্তা করল বাড়্রি চলে যাবে। বাড়ি আসার পথে তারা ভাবল, জংগলে ঐ লোকটার সাথে তারা দেখা করে তাদের অভিজ্ঞতার কথা বলবে। আর বলবে, কেন তিনি এই বাজে পরামর্শ দিয়েছিলেন।

তার কাছে আসার পর, সাধু লোকটি বলল, তোমরা তাহলে এসেছ। তোমরা কি সুতি কাপড়ের টুকরো নিয়ে এসেছ। না আমরা নিয়ে আসিনি। আর আমাদের এটা খুজতে যাওয়াটা হয়েছে বোকামি। একথা শুনে লোকটি বলল, তাই বুঝি। রাজা বলল, হ্যা। আপনি এরকম টা কেন করলেন আমাদের সাথে।

ভালবাসার কবজ এর কাপড় না পেয়ে খালি হাতে সাধুর কাছে

আমরা কত দেশে গিয়েছি কত গ্রামে গিয়েছি কত মানুষের সাথে দেখা করেছি। কিন্তু তবুও আমরা সেই সুতি কাপড়ের টুকরু পাইনি। তখন রানী বলল, আমার স্বামী ঠিক বলেছে। আমরা শুধু খালি খালি সময় নষ্ট করেছি।রাজা রানীর কথা শুনে লোকটি হাসলো। তাহলে কি এই যাত্রায় আপনাদের কোন লাভ হয়নি। আপনারা এখান থেকে কিছুই শিখতে পারেননি। লোকটির এসব কথা শুনে রাজা রানী অবাক হয়ে গেল।

তারা দুজনে ভাবল লোকটি কি বলতে চায়। রাজা বলল, আপনি কি বলতে চাইছেন। সাধু লোকটি বলল, আপনারা নিজেকে জিজ্ঞেস করুন। আর এই যাত্রায় থেকে কোন কিছুই কি শিখতে পারনি। তারা বলল, আমরা অনেক কিছু শিখতে পেরেছি। কেননা সন্তুষ্টি হল এই পৃথিবীর অমুল্য উপহার। আর রানীও সন্তুষ্টি থাকতে শিখে গেছে। একজন মানুষ কিভাবে সন্তুষ্ট থাকবে সেটা তাকে জানতে হবে।

রাজা হিরন আর রানী জারা এতদিন বুঝলো যে, এই লোকটা তাদের কে কি বোঝাতে চেয়েছে। তারা কি শিক্ষা লাভ করলো। তারপর তারা একে অপরের হাত ধরে গভীর প্রেমে ডুবে গেল। সাধু লোকটি তাদের কে আর্শিবাদ করলো। তোমাদের মনে আছে প্রকৃত ভালবাসার কবজ। সেটা তোমরা সামলে রাখবে। তোমাদের মনের মাঝে যেন ঐ অসন্তুষ্ট অশুভ ছায়া ছাপ ফেলতে না পারে।

তারপর রাজা রানী সাধু লোকটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে তারা তাদের রাজ্যে চলে গেল। এভাবে যতদিন যেতে লাগল তাদের মাঝে ভালবাসা আরো গভীর হয়ে গেল। আর তাদের মনের মাঝে যে সুখি ভালবাসার কবজ খুজে পেয়েছে  তাকে নিয়ে তারা সুখে শান্তিতে জীবন যাপন করতে থাকলো।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়, ঐ প্রথম যে সুখি রাজা রানী ছিল তাদের একটা সন্তান হলো। পরের লোকটির ছেলে সুস্থ হলো। আর ছাগল পালক লোকটি আর কেউ নয়। তিনি হলেন জংগলের সেই লোকটি। তিনি ছদ্দবেসে রাজা হিরন আর রানী জারার চোখ খুলে দিয়েছিল।

বন্ধুরা, ভালবাসার কবজ গল্প টি থেকে আপনারা যে শিক্ষা পেলেন। আপনারা তাই নিয়ে সুখে শান্তিতে বসবাস করবেন। তবে বেশি সুখের আশা করবেন না। তা হলে ভালবাসার কবজ গল্প এর রাজা রানীর মত যৌবনের বাকি সময় চলে যাবে। ধন্যবাদ