বুদ্ধিমান নাপিতের-গল্প

0
33
বুদ্ধিমান নাপিতের-গল্প
বুদ্ধিমান নাপিতের-গল্প

আসসালামুয়ালাইকুম বন্ধুরা। আপনারা সবাই কেমন আছেন? আশা করি, মহান আল্লাহ তা-আলার রহমতে  আপনারা সবাই ভালো আছেন। আজকে আমি আপনাদের কাছে বুদ্ধিমান নাপিতের মজার গল্প টি নিয়ে এসেছি। আশা করি সবার ভালো লাগবে। চলুন তাহলে বন্ধুরা আর কথা না বাড়িয়ে, এখন শুরু করি সেই মজার বুদ্ধিমান নাপিতের গল্প টি।

বুদ্ধিমান নাপিতের গল্প

এই যে, ঠাকুর মশাই আপনার সাথে একটা কথা ছিল। ঠাকুর বলল- বলুন না কি বলবেন। দেখুন এতটা বছর আপনার সাথে থেকে যোগ্যকরা, বঙ্গপাত, ব্রত করা সবকিছু শিখে গেছি। আপনার সাথে থেকে প্রায় সব কাজ তো আমি করি।

তবুও তারা আপনাকে সম্মান করে। আর আমাকে নাপিতের ছেলে বলে উপহাস করে। ঠাকুর বলল- বুঝলাম। তাহলে তুমি খাবার জোটাও কি করে। তাই আমি ঠিক করেছি দূরের কোথায় গ্রামে চলে যাব। আমি সেখানে বামন সেজে সব কাজ করব। আর আমি সেখানে সম্মানও পাব।

ঠাকুর বলল- কি বললি নাপিতের পোলা কি বললি তুই, নাপিতের পোলা নাপিত তুই বামন হবি। তুই বামন হয়ে পূজো করবি। দূর হয়ে যা হতভাগা আমার সামন থেকে। চলে যাচ্ছি, লাগবে তো শুধু নামা-বলি, আর দু পয়সার কলকি। তোমার সাথে এই তো আমার তফাৎ। আমি চললাম।

সবাই আমাকে হেনস্তা করে এখানে। ঐ বামন ঠাকুর এর চেয়ে কিসে কম আমি। মন্ত্র, তন্ত্র যা আছে সব বিধানে জানি আমি। তবুও আমাকে নাপিত বলে খোটা দেয়। মানুষকে বললে তো জানবে, না বললে কি করে জানবে। আমি যদি এখানে থাকি তাহলে আমাকে বামনের চাকর হয়ে থাকতে হবে। আগে আমি অন্য গ্রামে যাই। তারপর দেখিয়ে দেব টাকা আর মান কিভাবে জোগার করি।

তা যদি না করতে পারি তাহলে আমার নামও পরাণ পরামানিক না। পরাণ পরামানিক এভাবে কথা বলতে বলতে অনেকটা পথে চলে গেল। সে খুব ক্লান্ত হয়েছিল। সে সামনে একটা অনেক বড় বাড়ি দেখতে পায়। বাড়ি দেখে সে গাছের আড়ালে লুকিয়ে, তার জামা কাপড় পরিবর্তন করে বামন সাজে। তারপর সে এই বাড়ির দিকে চলে যায়। বাড়ির সামনে গিয়ে বলে ঘরে কেউ আছ গো। আমার খুব তৃষ্ণা পেয়েছে একটু জল দেবেন।

বামন সেজে আশ্রয়

বুদ্ধিমান নাপিতের গল্প এ বামন এবার অন্য গ্রামে চলে যায়। সেখানে বুদ্ধিমান নাপিত বামন সেজে বাড়ির এক লোক কে ডাক দেয়। তখন বাড়ির একজন বের হয়ে বলে, কে ডাকে। আপনি কে, পরাণ পরামানিক বলল, আমি পরান ঠাকুর। আমি পূজো করে বেড়াই, অনেক দূর থেকে এসেছি। আমাকে যদি বিশ্রামের জায়গা করে দিতেন। আমি আপনাকে আশির্বাদ করতাম। লোকটি বলল, যদি আপনি কৃপা করেন তাহলে আমার ঘরে থাকতে পারেন।

আমি কায়েপের ছেলে বামনের পায়ের ধূলো পেলে, গেরেস্তর মজ্ঞল হয় শুনেছি। আমি আপনার থাকার ব্যাবস্থা করছি আসুন। পরাণ পরামানিক বলল- আমি কিন্তু সৎ পাত অনুগ্রহন করে থাকি। জি আমি বুঝতে পেরেছি।

পরের দিন সকালে, সে পূজো করে গ্রামের সকল ছেলে মেয়েদের পড়াছেন, একদশ এক এগারো, এক দশ দুই বারো এভাবে। এমন সময় এক লোক এসে বামন কে বলল, ঠাকুর মশাই। একটা বিধান নিতে এসেছি ঠাকুর মশাই। বলুন তাহলে, গতকাল রাতে ঘুমের মধ্যে আমার পা দু-খানা মা লক্ষ্মীর আসনের দিকে ঘুরে গিয়েছিল। তাই আমার গিন্নি বলল নিশ্চই কোন পাপ হয়েছে।

ঠাকুর মনে মনে বলে, (কেমন আহাম্মক) সেটা তো হয়েছে রে বাপ সেটা তো হয়েছে। যাকে বলে হাতের লক্ষ্মীকে পায়ে ফেলেছিস। লঘু বলল- একটা উপায় বলুন ঠাকুর মশাই আপনি তো বামন মানুষ। ঠাকুর বলল একটা বড় যোগ্য করতে হবে। শোন তুমি চাল, ডাল, আলু, ফল এসব দিয়ে যাবে সঙ্গে একশত টাকা। মা লক্ষ্মীকে উৎসর্গ করে দেব। ঠিক আছে ঠাকুর মশাই ঠিক আছে। আমি তাই করব আমি সব দিয়ে যাব।

সেই দিন সন্ধ্যা বেলা, একজন মহিলা ও একজন পুরুষ তার কাছে চলে আসে আর বলে প্রনাম ঠাকুর মশাই প্রনাম। আমাদের একটা আর্জি ছিল। আমাদের একটা মেয়ে আছে অরুণ। আমাদের এই মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না শুধু বয়স বাড়ছে।

ঠাকুর বলল, বুঝেছি এখন কি করতে পারি আপনাদের জন্য বলুন। আপনি তো বামন, দয়া করে আপনি আমার মেয়েকে উদ্ধার করেন। ঠাকুর মনে মনে বলে, এতো দেখছি ঘাটে না নামতেই এক ঘটি। আমাকে বামন ভেবে তার মেয়ের সাথে বিয়ে দিতে চাইছে।

বুদ্ধিমান নাপিত পরান ঠাকুরের বিয়ে

এই  ভেবে সে  তাদের কে বলে, আমার তো চাল নে চুলও নেই। আমি তো পরের ঘরে থাকি। আমার নিজস্ব বাড়ি আছে। আপনি না হয় সেখানে থাকবেন। বাড়িটি আপনাকে যৌতুক হিসাবে দিয়ে দেব। আমার কালো মেয়েকে বিয়ে করার তেমন উৎসাহ নেই। তবুও আপনি বলছেন বলে রাজি হলাম। আর বিশেষ করে আপনি স্ব জাতি। বিপদে পরেছেন বলে আমি আপনাকে উদ্ধার করতে যাচ্ছি। আপনি বিবাহের ব্যবস্থা করুন। বুদ্ধিমান নাপিতের গল্প এ বামন এবার বিবাহ করবেন।

তার কয়েক দিন পরে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের পরে বাসর রাতে সেই ঠাকুর বলে, এই যে, বামনের মেয়ে আমার জন্য এক গ্লাস জল নিয়ে আসো তো। এই কথা শুনে মেয়েটি চমকে যায় কিছু না বলে সে জল নিয়ে আসে।

ঠাকুর বলল, দেখ মেয়ে তোমার বাবা, মা আমার হাতে পায়ে ধরেছিল বলে আমি তোমাকে বিয়ে করেছি। তাছাড়া আমি তোমার মত কালো মেয়েকে বিয়ে করতাম না। এই কথাটা তুমি ভালো করে মনে রেখ বুঝলে।

তুমি যদি আমার ভালো মতো সেবা যত্ন না করে। তাহলে তোমার জন্য সুন্দরী সতী সতিন নিয়ে আসবো কথাটি ভালো করে মনে রেখ কিন্তু। মেয়েটি মাথা নেড়ে নেড়ে বলল ঠিক আছে। ঠাকুর বলল, তাহলে ঠিক আছে। এখন তাহলে আমার পা দু-টো ভালো করে টিপে দাও। আমার পা দু-টো খুব ব্যাথা করছে। এবাবে তাদের রাত পেরিয়ে সকাল হল।

সকাল বেলা ঠাকুর মশাই পথ দিয়ে যাচ্ছিল হঠাৎ দেখে একটা লম্বা লাইন। তাই সে জিজ্ঞাসা করে ভাই এখানে লম্বা লাইন কেন। সেখান থেকে একজন বলে, এখানে যিনি আছেন তিনি ভাগ্য গনণা করে এবং মানুষের ভবিষৎ বলে দিতে পারে।

তখন ঠাকুর বলে, ভাগ্য যদি আগে থেকে জানা থাকে তাহলে আর মন্দ কি। এই কথা বলে, ঠাকুর মশাই হাত দেখাতে চলে যায়। যতিষী বলল, দেখি দেখি তোমার হাত টা, হাত দেখতে গিয়ে সে বলে তোমাকে তো চেনা চেনা লাগছে। তোমায় যেন কোথায় দেখেছি। ঠাকুর মশাই বলে, আপনি এই গ্রামে নতুন তাহলে আমাকে কেমন করে দেখলেন।

যতিষির মন্ত্রে পরাণ ঠাকুর নাজেহাল

যতিষী বলল, তুমি আমাদের গ্রামের পরাণ নাপিত না। তখন সে বলে, আস্তে বলুন আস্তে কেউ শুনে ফেলবে। আমি না হয় তোমাকে দশটা টাকা দিচ্ছি। বেশ বেশ শুধু দশ টাকা, এই টাকা নিয়ে কতখন চুপ থাকব বলতো। ঠিক আছে বুঝেছি এই নাও বিশ টাকা। এই কাউকে বল না কিন্তু। এই কথা বলে সে সেখান থাকে চলে যায়। আর ভাবতে থাকে কি লাভ হল এখানে এসে শুধু গোপন কথা ফাঁস হল।

তারপর যতিষীর কাছে পরাণ ঠাকুরের বউ ও তার মা চলে আসে। এসে বলে, আমার মেয়ের হাতটা দেখুন তো। কবে তার কপালে সুখ আসবে, নাকি আদৌ সুখ আসবেনা। যতিষী বলে, দেখি দেখি তোমার হাতটা দেখি। হাত দেখে যতিষী বলে, আপনার মেয়ে কালো বলে বিয়ে অনেক দেরিতে হয়েছে।

হ্যা আপনি ঠিক বলেছেন, অনেক কষ্টে  জীবন কাটছে বুঝি। আপনার স্বামীর সাথে তেমন সম্পর্ক নেই। মেয়ে মা বলল, আপনি তো সব দেখতে পারছেন। বড় নিরীহ ঐবেচারা কি করলে সে তার স্বামীর মন পাবে একটু বলে দেন। যতিষী বলল, আপনার জামাতার নাম কি। পরাণ চক্রবত্রী একটু আগে যে এখান থেকে চলে গেল।

যতিষী বলে, ও আচ্ছা ঠিক আছে আমি আপনার মেয়েকে একটা মন্ত্র শিখিয়ে দিতেছি। ও বাড়ি ফিরলে একটা নরুন হাতে নিয়ে এই মন্ত্র পাঠ করলেই। আস্তে আস্তে আপনার মেয়ের জামাই মেয়ের বসে চলে আসবে চিন্তার কোন কারণ নেই। তারপর যতিষী, সেই মেয়েটির কানে কানে মন্ত্রটি শিখিয়ে দেয়। তারপর তারা বাড়ি ফিরে আসে।

তারপর পরাণ ঠাকুরও বাড়ি চলে আসে। এসে শুয়ে পড়ে এবং সে বলে এই যে বামনের মেয়ে একটু চা জলপরা দাও। দাঁড়াও এখনে দেখাচ্ছি মজা আমি বামনের মেয়ে তাই না। পরাণ ঠাকুর বলল, ওখানে কি করছ বল দেখি। পরাণ ঠাকুরের বউ বলে এই দেখ এই টা। সে একটা নরুন দেখায় আর যতিষীর সেই মন্ত্রটি পাঠ করতে শুরু করল, মন্ত্রটি হল, আতা গাছে তোতা পাখি ডালিম গাছে মউ, কদম তলে নাপিতের বেটার অন্যের ঘরে বউ।

বউয়ের প্রতি ভালবাসা

পরাণ ঠাকুর বলে, হায় হায় তুমি এসব জানলে কি করে। তোমাকে এসব কথা কে বলেছে। যতিষী আমাকে সব কথা বলেছে আর এই মন্ত্রটি শিখিয়েছে। পরাণ ঠাকুর বলে হায় রে বদমাশ আমাকে তুই বউয়ের কাছে বস করে দিলি। তোমাকে যা বলেছে বলেছে তুমি আর কাউকে বলনা। বললে তোমার কপালে দুঃখ আছে।

যদি বল কোন দিন তাহলে তোমার চুলের মুঠি ধরে মারবো। এই কথা স্ত্রী শুনার পর বলে, আতা গাছে তোতা পাখি ডালিম গাছে মউ, কদম তলে নাপিতের বেটার অন্যের ঘরে বউ। আরে কি করছো গ্রামের লোকজন জানতে পারলে। আমাকে বিন্দাবনের টিকেট ধরিয়ে দেবে। পরাণ ঠাকুর বলল, আরে শোন গো আমার লক্ষ্মী। আমি তো তোমার সাথে তামাসা করছিলাম।

বল আমি কি তোমাকে কখনো মারতে পারি। পরাণ ঠাকুর বউ বলে, যতিষী তো খুব ভালো মন্ত্র শিখিয়ে দিয়েছে। যাই হোক এই শোন তোমার সাথে আর আমি কোন কথা বলতে পারব না। সারা দিন অনেক কাজ করেছি। আরে শোনো, এখন আমি তো আছি তোমার সব কাজ আমি করিয়ে দেব। এই কথা পরাণ ঠাকুর বউ শুনে মনে মনে হাসে। এই সুযোগে সে বলে আমার পা টা খুব ব্যাথা করছে, আমি এখন শুয়ে পড়ব।

পরাণ ঠাকুর বলে, ঠিক আছে তুমি শুয়ে পড় আমি তোমার পা টিপে দিচ্ছি। আরে এই মন্ত্রে তো ভালো কাজ হচ্ছে এই মন্ত্রে অর্থ কি? পরাণ ঠাকুরের বউ এই কথা ভাবে। পরাণ ঠাকুরের শ্বাশুরী জানালা দিয়ে তাদের এই সব কান্ড দেখে আর হাসতে থাকে। আর ভাবে এখন আমার মেয়ের কপালে সুখ আসল। আজকের মতো গল্প এখানে শেষ।