তিন তলা মাটির ঘর

0
33
তিন তলা মাটির ঘর
তিন তলা মাটির ঘর

আচ্ছালামুয়ালাইকুম বন্ধুরা। আপনারা সবাই কেমন আছেন? আশা করি ভাল আছেন আপনারা। আজকে আপনাদের জন্য একটি অন্য রকম রুপকথার গল্প নিয়ে এসেছি। আর আমি গল্পটির নাম দিয়েছি তিন তলা মাটির ঘর। আশা করি রুপকথার গল্প তিন তলা মাটির ঘর গল্পটি পড়লে আপনাদের ভাল লাগবে।

তিন তলা মাটির ঘর

দুই বোন একসাথে বাস করত। বড় বোনের নাম ছিল তিথি আর তার ছোট বোনের নাম ছিল ইতি। অনেক আগে তাদের বাবা মা মারা যায়। তিথি তার বাবার কাছ থেকে মাটির হাড়ি পাতিল বানানো শিখেছিল। তিথি মাটির জিনিস পত্র বানিয়ে তা বিক্রি করে সংসার চালাত।

একদিন তিথি তার ছোট বোন ইতি কে ডাকলো, বোন এই বোন কোথায় তুই? তারাতারি এদিকে আয় তো একটু। তার ডাক শুনে ইতি বড় বোনের কাছে গেলো আর বললো, হ্যা বল। কি হয়েছে? যখন তখন এভাবে ডাকাডাকি করো কেন বলতো? এসব ডাকাডাকি আমার এক দম ভাল লাগে না। তিথি বলে, কোথায় আমি ডাকাডাকি করি বল তো? বোন আমি মাটির পাত্র গুলো রোদে শুকাতে দেব। তুই আমায় একটু সাহায্য করতো, মাটির পাত্র গুলো বের করে রোদে শুকাতে দিতে।

তিন তলা মাটির ঘর গল্পের ইতি তার বড় বোনকে বলে, কি বললি তুই? আমি তোর সাথে এই রোদ এর মধ্যে দাঁড়িয়ে, মাটির তৈরী পাত্র গুলো রোদে শুকাতে দেবো? তুই কি পাগল হয়ে গেছিস নাকি, হ্যা। আমি রোদে থাকলে তো কালো হয়ে যাব। আর শোন দিদি ওসব কাদা মাটির জিনিস হাত দিয়ে ধরলে আমার খুব অসস্থি হয়। তাই তুই আর আমাকে এসব কাজ করতে বলবি না। এই বলে ইতি ঘরের মধ্যে চলে গেলো।

ইতির এসব কথায় তিথি হতবাক হয়ে যায়। আর বলে, ইতিকে দিয়ে কোন কাজই করানো যায় না। আমি একা খেটে মরছি আর ইতির কোন চিন্তায় নেই। আর থাকবেই বা কেন? ইতি তো এখনো ছোট। এমনি হাতে পায়ে বড় হয়েছে, কিন্তু আসলে ও তো ছোটই আছে।

যাক, আমি এসব না ভেবে হাত চালিয়ে মাটির পাত্র গুলো তারা তারি রোদ এ দেই। রোদ তো আমার জন্য আর থাকবে না। রোদ তো চলে যাচ্ছে আবার। এর পর তিথি নিজেই একা একা মাটির পাত্র গুলো রোদে শুকাতে দেয়। আর এভাবেই তিথি আর ইতির দিন চলে যায়।

এরভাবে বেশ কিছু দিন কেটে যায়। হঠাৎ একদিন জমিদার গিন্নি তিথিদের বাড়িতে আসে। তিথি জমিদার গিন্নিকে দেখে বলে, আরে রানি মা যে। আপনি এই গরিবের বাড়িতে যে এসেছেন। তা বসুন রানি মা। এরপর তিথি তার বোন কে ডাকলো, আর বলল ,বোন তারাতারি করে একটা মোরা আনতো। রানি মা আমাদের বাড়িতে এসেছেন। তিথির ডাক শুনে ইতি, একটা মোরা এনে রানি মাকে বসতে দিল।

তিন তলা মাটির ঘর গল্পের জমিদার গিন্নি তিথিকে বলে, দাসীদের কাছ থেকে শুনলাম তুমি নাকি খুব ভাল ,মাটির জিনিস পত্র বানাতে পারো? এই কাজ করে নাকি তুমি গ্রামের লোকেদের কাছ থেকে অনেক সুনাম ও পেয়েছো? তা আমার একখানা জিনিসের বায়না নাও না?

তিথি বলে, সুনাম আর কি রানি মা, ভাল মত মনযোগ দিয়ে কাজ করি তো। তাই গ্রামের মানুষ বলে। তা বলুন রানি মা আপনার জন্য কি বানিয়ে দেব? জমিদার গিন্নি বলে, তেমন কিছু না আমাকে শুধু একটা তিন তলা মাটির ঘর বানিয়ে দিবে।

আর সেই ঘরে যেন সেই জমকালো রঙের কাজ করা থাকে। এই কাজ কিন্তু খুব তারাতারি করতে হবে, মানে সাত দিনের মধ্যে করে দিতে হবে। আমি তোমাকে এই কাজের জন্য ১০০ সর্ণ মুদ্রা দিবো। আমি সাত দিন পরেই তিন তলা মাটির ঘর নিতে আসবো। তিথি বলে, আচ্ছা রানি মা আপনি যেভাবে চাইবেন আমি সেভাবেই আপনাকে মাটির তিন তলা ঘর বানিয়ে দেব। এর পর জমিদার গিন্নি তিথি দের বাড়ি থেকে চলে যায়।

তিথি এত গুলো টাকার কাজ পেয়ে খুব খুশি হয়। কিন্তু ইতি রানির মুখে তিথির প্রশংসা শুনে ভেতরে ভেতরে অনেক রেগে যায়। আর তার দিদি বলে, তোকে দেখে মনে হচ্ছে খুব খুশী হয়েছিস। তা বলছি এত খুশি হবার কিন্তু কিছুই হয় নি। রানিমা কিছু প্রশংসা করেছে বলে নিজেকে আহামরি কিছু ভাবার দরকার নেই। তুই তারাতারি তিন তলা মাটির ঘর বানানোর প্রস্তুতি নে।

রানি টাকা গুলো দিলে আমি কিছু জামা কাপড় কিনবো।  এসব বলে ইতি সেখান থেকে চলে যায়। তিথি ইতির এসব কথাকে কোন মুল্য দেয় না। সে ছেলে মানুষী ভেবে কিছু মনে করে না। তিথি নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এভাবেই সেদিন চলে যায়।

পরের দিন সকালে তিথি ঘুম থেকে উঠে দেখে, তার জর জর ভাব হয়েছে। সে খুব অসস্থি বোধ করছে আর নিজে নিজে বলছে, এবার কি হবে? আমার তো জ্বর জ্বর লাগছে। মাথাটাও বেশ ব্যথা করছে।। এই শরীর নিয়ে আমি নদী থেকে কাদা মাটি আনবো কি করে? আর তিন তলা মাটির ঘর টাই বা বানাবো কি করে? আর সময় ও তো বেশি নেই মাত্র সাত দিন।

ইতি একটু রেগে বলে, দিদি সকাল সকাল আমার কানের মাথা খাচ্ছিস কেন? কথা বলতেই যদি হয় তাহলে বাইরে গিয়ে বললেই তো হয়, তাহলে তো আমার আর সমস্যা হয় না। আমায় একটু শান্তি করে ঘুমাতে দে।

তিথি জ্বর নিয়ে বিছানা থেকে ওঠে। কিছুক্ষণ পর ইতি এসে বলে, দিদি খাবার রান্না করেছিস কি? আমার খুব খিদে পেয়েছে। আমায় খেতে দে। তিথি তার বোন ইতিকে বলে, বোন আজকে আমার শরীরটা ভালো লাগছে না। তাই এখনো রান্না করতে পারি নি। তবে তুই চিন্তা করিস না বোন, আমি এক্ষুণি রান্না চাপিয়ে দিচ্ছি। আর বোন আমার শরীরের অবস্থা ভাল না। এই অবস্থায় আমি কিছুতেই নদী থেকে কাদা মাটি আনতে পারবো না।

তুই একটু কষ্ট করে আজকে কাদা মাটি এনে দিবি? আর বুঝিস এ তো তিন তলা মাটির ঘর এর জন্য অনেক টাকার বায়না আর সময় ও কম। ইতি এসব কথা শুনে বেশ কিছু ক্ষণ ভাবে আর বলে, হুম সেটাই তো দিদি অনেক গুলো টাকার ব্যাপার। আচ্ছা তুই রান্না কর, আমি নদী থেকে কাদা মাটি নিয়ে এনে দিচ্ছি।

এই বলে ইতি কাদা মাটি আনার জন্য নদীতে যায়। সাথে করে নেই একটা মাটি বহন করার খাচা। ইতি নদী থেকে কাদা মাটি তার খাচায় তুলে নেয়। মাটি খাচায় তুলে নিয়ে সে বাড়ির দিকে রওনা দেয়। আর রাস্তায় বলে, এ মা এই মাটি গুলোর কি ওজন রে বাবা। দিদি যে কি করে এই মাটি গুলো মাথায় করে প্রত্যেক দিন নিয়ে যায়। আমার তো ঘার থেকে মাথা খুলে যেতে চাচ্ছে। এসব বলে বলে ইতি হাটছিল।

ঠিক কিছুক্ষণ পর ইতি রাস্তার পাশে পরে থাকা একটি মাটির তৈরী তিন তলা বাড়ি দেখতে পায়। আর ইতি মাটির খাচা রেখে সেই মাটির তৈরী তিন তলা ঘর এর দিকে যায়। আর বলে, বাহ কি সুন্দর তিন তলা মাটির ঘর। ঠিক রানি মার বায়না দেয়া ঘরের মত, মাটির তৈরী তিন তলা ঘর। আমি এই ঘরটাই বরং বাড়ি নিয়ে যাই। এই ঘরের সাহায্যে আমি দিদির মন জয় ও করতে পারবো। আর রানি মার থেকে সুনাম ও নিতে পারবো। তিনি আমার প্রশংসা ও করবেন।

এই সব ভেবে ইতি তিন তলা মাটির তৈরী ঘরটি তুলে নিয়ে বাড়িতে যায়। বাড়িতে গিয়ে তার বোন তিথিকে বলে, দেখ দিদি আমি কত সুন্দর একটা তিন তলা মটির ঘর বানিয়েছি। তোর শরীর খারাপ বলে আমি মাটি না এনে। একেবারেই তিন তলা মাটির ঘর বানিয়ে তার পর সেটা নিয়ে এসেছি। তিথি বলে, কি বলছিস এসব এই টুকু সময়ে পুরো একটা তিন তলা ঘর বানিয়ে ফেললি? যাক, তুই যখন বলছিস আমি মেনে নিলাম। এই কথা বলতে না বলতেই, মাটির তৈরী তিন তলা ঘর থেকে একটা পরী বেরিয়ে আসে।

পরী বাইরে এসে বলে, অলস মিথ্যেবাদি মেয়ে। তুমি আমার ঘরটা তুলে নিয়ে এসে এখানে মিথ্যে কথা বলছো। যে এই ঘরটা তুমি বানিয়েছো। এই মাটির তিন তলা মাটির ঘরটি আমার ঘর। এই তিন তলা মাটি ঘরটি আমি জাদু দিয়ে তৈরি করেছি। কারন মাটির এমন ঘর আমার খুব পছন্দ। এখানে থাকতে আমি খুব পছন্দ করি। সেই জন্য আমি আমার তিন তলা মাটির তৈরী ঘরে ঘুমাচ্ছিলাম।

আর ঠিক তখনি তুমি আমার এই জাদুর তৈরী তিন তলা মাটির ঘর টি তুলে নিয়ে এসেছো। আর আমার ঘুম ভাঙ্গতেই শুনি। তুমি তোমার দিদির সামনে আমার জাদুর তৈরী তিন তলা মাটির ঘর নিয়ে মিথ্যা কথা বলেছো। এর জন্য তোমাকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে।

এই কথা শুনে তিথি পরীকে করুণশস্বরে বলে, দয়া করো পরী আমার বোনের উপর। সে এখনো অনেক ছোট। ও ভুল করেছে আর ভুল করবেই না কেন? আমাদের যে খুব শিঘ্রই একটা তিন তলা মাটির ঘরের দরকার ছিল। তাই না বুঝে তোমার ঘরটাই তুলে এনেছে। আর সে বুঝতে পারে নি, তাই সে মিথ্যা কথা বলেছে। আমার বোন ইতিকে তুমি শাস্তি দিয়ো না। আমার ছোট বোনের পক্ষ থেকে আমি ক্ষমা চাইছি। ক্ষমা করো ইতিকে তুমি পরী।

এসব শুনে ইতি তার বড় বোন তিথিকে বলে, দিদি আমি তোকে কত কথা শুনিয়েছি, আমি তোর কোন কথা শুনিনি। আর সেই তুই আমাকে বাচানোর জন্য পরীর কাছে ক্ষমা চাইছিস? আমার ভুল আজকে আমি বুঝতে পেরেছি। আমাকে তুই ক্ষমা করে দিস দিদি। আর আমি পরীকে সাক্ষী রেখে বলতেছি, আজকে থেকে আমি তোর সব কথা শুনবো। আর তোকে আমি সব কাজে সাহায্য করব। আর কখনোই লোভ করবোনা।

ইতির নিজের ভুলের কথা নিজে স্বীকার করাতে পরী বললো, তোমার এই ক্ষমা চাওয়া দেখে আর নিজের ভুল বুঝতে পেরে। তোমার দিদির কাছে মাফ চাইতে দেখে আমি বড়ই খুশি হলাম। তুমি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছো। তাই আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। আমি তোমাকে আর কোন শাস্তি দিবো না। আর তুমি যেহেতু আমাকে তোমাদের বাড়ি এনেই ফেলেছো। তাই আমি তোমাদের সাহায্য করবো।

এই বলে পরী তার জাদুর লাঠি ঘুরিয়ে, তাদের সামনে একটি তিন তলা মাটির ঘর এনে দেয়। আর সেখান থেকে চলে যায়। এরপর সাত দিনের দিন জমিদার গিন্নি আসে। তার বায়না দেয়া মাটির তৈরী তিন তলা ঘর নিতে। আর তিথি পরীর দেয়া সেই তিন তলা মাটির তৈরী ঘর টি জমিদার গিন্নিকে দিয়ে দেয়।

জমিদার গিন্নি খুশি হয়ে ১০০ সর্ণ মুদ্রা তিথিকে দিয়ে দেয়। আর তার তিন তলা মাটির ঘর টি নিয়ে যায়। আর ওই ১০০ সোনার মুদ্রা দিয়ে দুই বোন খুব ভাল ভাবে জীবন যাপন করতে থাকে।

বন্ধুরা কেমন লাগলো আজকের রুপকথার গল্প তিন তলা মাটির ঘর তা কমেন্ট করে জানাবেন। ধন্যবাদ