গরিবের মেয়ের বিয়ে

0
33
গরিবের মেয়ের বিয়ে
গরিবের মেয়ের বিয়ে

আসসালামু আলাইকুম। বন্ধুরা আপনারা সবাই কেমন আছেন? আশা করি আল্লাহর রহমতে সবাই ভালো আছেন। আজ আমি আপনাদের কাছে একটি মজার গল্প নিয়ে এসেছি। আর সেই মজার গল্প এর আমি নাম দিয়েছি, গরিবের মেয়ের বিয়ে এর গল্প । আশা করি গরিবের মেয়ের বিয়ে গল্প টি সবার ভালো লাগবে।

গরিবের মেয়ের বিয়ে গল্প কাহিনী

দিয়া তার বাবা মায়ের সাথে রামপুর গ্রামে বাস করত। দিয়া এবার ক্লাস ফাইভ এ পড়ে। দিয়ার মা বাসায় সেলাই মেশিনের কাজ করত। তিনি তার সেলাই মেশিনে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা কাজ করতেন। তিনি আশে পাশের মহিলাদের জামা কাপর সেলাই করে দিতেন। এলাকার মহিলারা দিয়ার মায়ের কাছে কিছু না কিছু সেলাই করে নিতেন। কেননা তার হাতের কাজ খুব ভালো ছিল।

দিয়ার মা রিতা যখন বাসায় কোন কাজ করত তখন দিয়া তার মায়ের কাজে সাহায্য করত। কিন্তু তার মা তাকে পড়াশুনা করতে বললে দিয়া পড়তে যেত। আর রিতা একাই বাসার সব কাজ করত। বাড়ির কাজ শেষ করে রিতা আবারও সেলাই মেশিন এ বসে যেত। কোন কোন দিন সেলাই করতে করতে মাঝ রাত হয়ে যেত। কেননা দারিদ্রতার কারনে রিতাকে অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হত।

অন্য দিকে রিতার স্বামী সুজন মদ এর নেশা করে বেড়াত। সে কোন কাজ কর্ম করতো না। রিতা সেলাই করে যে অর্থ উপার্জন করত তা দিয়েই তাদের সংসার চলতো। এই সংসার চালানোর অর্থও সে জোর করে রিতার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে নেশা করত। রিতা জানত যে তার স্বামী টাকা দেখলেই সব নিয়ে যাবে। তাই রিতা গোপনে একটা মাটির ব্যাংক এ করে টাকা জমাতো।

এই টাকা সে লুকিয়ে জমাতো যেন তার স্বামী দেখতে না পায়। রিতা আগে থেকেই যে টাকা পেত, তিনি সেখান থেকেই অল্প করে প্রতিদিন টাকা রাখতো। একদিন তার মেয়ে দিয়া বলে মা, তুমি রোজ রোজ কেন এই মাটির ব্যাংক এ টাকা ঢুকিয়ে রাখো? টাকা তো খরছ করার জন্য তাই না?

রিতা তার মেয়েকে বললো, না মা সব টাকা খরছ করতে নেই কিছু টাকা এই মাটির ব্যাংক এ জমিয়ে রাখতে হয়। যাতে খারাপ সময় আসলে সেই সময় এগুলো খরছ করা যায়। বুঝলে আমার লক্ষী সোনা। তার মেয়ে বলে ও আচ্ছা এই কথা। তাহলে আমি খেলতে গেলাম মা আমার বান্ধুবিরা ডাকছে।

রিতা বললো ঠিক আছে যাও কিন্তু তারাতারি বাড়ীতে ফিরো। বাইরে বেশি সময় থাকলে তোমার বাবা রাগ করবে তোমার উপর। এর পর দিয়া খেলতে যায় আর রিতা মাটির ব্যাংক এ টাকা রেখে ব্যাংকটা লুকিয়ে রাখে। এর পর পরই সুজন ঘরে ঢোকে। মদের নেশায় সে খাবার খেতে চায়।

যখন রিতা তার স্বামীকে খেতে দেয় তখন তার স্বামী সুজন বলে, এসব কি রান্না করেছিস? রান্নায় না আছে লবন না আছে ঝাল। এই অখাদ্য রান্না করে রেখেছিস, নিয়ে যা এগুলো আমার চোখের সামনে থেকে। আর আজকে কিন্তু তোর টাকা আমি পাই নি। বের কর ,বের কর টাকা গুলো আমাকে দিয়ে দে বলছি। টাকার অনেক দরকার।

এই বলে বাক্স এর দিকে চলে গেলো সুজন। রিতা বলছে শোন না এই বাক্সটা দয়া করে খোল না। ওর ভিতরে অল্প কিছু টাকা আছে। ঘরে চাল ডাল সব ফুরিয়ে গেছে। সেগুলো আনতে হবে জন্যই অল্প কিছু টাকা জমিয়ে রেখেছি। সুজন তার একটা কথাও শুনলো না।

সুজন বাক্স থেকে টাকা বের করে মদের নেশায় তার স্ত্রীকে ধাক্কা মেরে ঘর থেকে বের হয়ে চলে গেল। সেই সময় দিয়া বাড়িতে চললে আসে। তার মাকে এই অবস্থায় দেখে কাদতে শুরু করে। রিতা দিয়াকে অনেক বুঝানোর পর সে চুপ করে। এইভাবে তাদের দিন কাটছিলো।

রিতা সারা দিন সেলাই মেশিনে কাজ করে টাকা রোজগার করে। আর ওদিকে সুজনের খারাপ অভ্যাস গুলো সময়ের সাথে বাড়তে থাকে। এখন তো সুজন রীতি মত জুয়াও খেলে। অবস্থা এমন হলো সুজন বাসার জিনিস পত্র বেচে সেই টাকা দিয়ে জুয়া খেলতে লাগলো।

একদিন দিয়া পায়েস খেতে চাইলে। তার মা বাজার যায় চাল চিনি দুধ আনতে। আর দিয়াকে বলে, বাড়ির খেয়াল রাখতে। ঠিক কিছুক্ষণ পর কিছু লোক দিয়াদের বাসায় ঢুকে বিভিন্ন জিনিস ভাংতে শুরু করে। রিতা যখন বাড়ি ফিরে আসে এসব দেখে সে অনেক ভয় পেয়ে যায়। ভয়ে দিয়ার জন্য আনা পায়েসের চাল চিনি দুধ তার হাত থেকে পড়ে যায়।

সে কান্না স্বরে চিৎকার করে বলে কি করছেন। আপনারা আর কেনই বা করছেন এসব ভাংচুর। তারা কোন উত্তর না দিয়েই ভাংচুর করতে লাগলো। পরক্ষণেই একজন বলে উঠলো তোমার স্বামী এই বাড়ি আমাদের বসের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। তোমরা এখনি এই বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যাও। তোমরা কোথায় যাবে কি করবে তাতে আমাদের কিচ্ছু যায় আসে না।

রিতা কান্না স্বরে বলতে থাকে, এই ভাবে কি বাড়ি বেচে দিতে পারে। আপনারা আমাদের এভাবে কিছুতেই বাড়ি থেকে বের করে দিতে পারেন না। আমরা কোথায় যাবো ? দিয়াও কান্না স্বরে বলে , মা এই লোক গুলো আমাদের সব জিনিস পত্র ভাংচুর করে ফেলেছে। এরা আমার পুতুল ও ভেঙ্গে দিয়েছে। যাও বলছি এখান থেকে এটা আমাদের বাড়ী। একজন ধমক দিয়ে দিয়াকে বলে এই মেয়ে চুপ কর। এখন এই বাড়ি আর তোদের না। এই বাড়ি এখন আমাদের মহাজনের।

রিতা আর দিয়া সারা রাত তালা বন্ধ ঘরের সামনে বসে থাকে। অনেক রাতে সুজন নেশা করে বাড়িতে আসে। রিতা সুজন কে বলে তুমি আমাকে না জানিয়ে বাড়ি বিক্রি করে দিলে। এখন আমরা এত রাতে যাবই বা কোথায়। তুমি এটা কি করলে? সে মাতাল হয়ে বলে, এই বাড়ি আমার ছিল আমার। তাই আমি বেচে দিয়েছি। আমার অনেক টাকার দরকার ছিল তাই আমি বিক্রি করে দিয়েছি। জিনিস পত্র তারাতারি গুছিয়ে নে। আমার বন্ধু সমির এর একটা বাড়ি আছে আজ থেকে আমরা ওখানেই থাকবো।

বেচারি রিতাই বা কি করবে দিয়ার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে গোছাতে শুরু করলো। মেয়েটা ক্ষুধায় কান্না করছে। মেয়েকে আজকে পায়েস রান্না করে খাওয়ানোর কথা ছিল। কিন্তু কি থেকে যে কি হয়ে গেলো বুঝতে পারলাম না। সেই রাতে তারা না খেয়েই কাটিয়ে দিল। দারিদ্রতা আর অভাব তাদের পাহাড় হয়ে দাড়িয়েছিল।

ছোট মেয়ে দিয়ার দিকে তাকিয়ে রিতা চুপ ছিল। সুজন রিতা আর দিয়াকে নিয়ে বন্ধুর ভাড়া করা বাড়িতে এসে থাকতে লাগলো। এভাবে সময় যেতে থাকলো। রিতা ভাড়া বাড়িতে এসেও সেলাই মেশিনের কাজ করতো। ওখানে তাকে যে অল্প কয়জন চিনতে শুরু করে তারা তাদের জামা কাপড় রিতার কাছ থেকে সেলাই করে নেয়। এখন সংসার চালানো সহ তাকে বাড়ি ভাড়া, পানি বিল বিদ্যুৎ বিল দিতে হত।

সময় কেটে যাচ্ছে । সাথে সাথে দিয়াও বড় হতে লাগলো। সে দেখতে যেমন সুন্দরী তেমনি বুদ্ধিমতি হয়েছিল। কিন্তু দারিদ্রতার কারনে দিয়া বেশিদুর পড়া শুনা করতে পারেনি। তাই বাড়িতেই মায়ের কাজে সাহায্য করত। রিতার বয়স হয়েছে।

সেলাই মেশিনে রিতা আর আগের মত কাজ করতে পারে না, চোখেও ভালো দেখে না , কেমন জানি আবছা দেখে। দিয়া তাকে কম কাজ করতে বললে রিতা দারিদ্রতার কারনে তার সমস্ত শক্তি দিয়ে কাজ আরো বেশি করে যায়। ধীরে ধীরে রিতার অবস্থা অবনতি হতে থাকে।

অন্য দিকে সুজন বাড়িতেই আর আসত না, কয়েক দিন পর পর বাড়িতে আসত। রিতা অসুস্থ হয়ে পড়ে। দিয়া বাড়িতে তার সেবা যত্ন করে। তবে রিতার মাথায় শুধু গরিবের মেয়ের বিয়ে দেওয়ার চিন্তা আসতো। কেনই বা আসবে না মেয়ে বড় হয়েছে তাকে তো বিয়ে দিতে হবে। রিতার একটাই ইচ্ছা ছিল যেন, সে মরার আগে দিয়ার বিয়ে দিতে পারে।

রিতার বাড়িতে এক মহিলা আসে। তার নাম ছিল রেসমা। তিনি তাদের আগের বাসার প্রতিবেশি ছিল। অনেক বছর পর তার বাসায় আসাতে রিতা দিয়াকে চা দিতে বলে। দিয়াও মায়ের কথা মত চা নিয়ে আসলো। দিয়া কে দেখে রেসমা বলে,এ আমাদের দিয়া না? অনেক বড় হয়েছে তো। ওর বিয়ের ব্যাপারে কি কোথাও কথা বলেছো? রিতা বলে না দিদি আমরা গরিব। গরিবের মেয়ের বিয়ে এত সহজে হবে। আর আমি ভালো ছেলে কোথায় পাবো।

দিয়ার বিয়ে নিয়েই আমার যত চিন্তা। একে বিয়ে দিতে পারলে আমি মরেও শান্তি পাবো। আমার শরীর ও ভালো যাচ্ছে না। আমার স্বামীর কথা তো আপনি জানেন, ওর বদ অভ্যাস আগের মতই আছে। রেশমা তার কথা শুনে বলল, আমার খোজে একটা ছেলে আছে। বেশ ভাল ছেলে বাবার জমি জমা আছে। তারাও মেয়ে খুজতেছে সুন্দরী আর সুশীল। দিয়াকে ওরা অপছন্দ করতে পারবে না।

ছেলে কাপরের দোকানে চাকরী করে। তেমন কোন চাহিদাও নেই। শুধু ভালো একটা মেয়ে হলেই তাদের হবে। তুমি যদি বলো তাহলে আমি আলাপ টা দিতে পারি। রিতা বলে, দিদি তুমি কথা বলো, যদি গরিবের মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। তাহলে আমার আর চিন্তা থাকবে না। তখন আমি মরেও শান্তি পাবো। মা খবরদার সব সময় মরার কথা বলবে না। রেসমা মাসি তুমি মাকে বোঝাও তো মা খালি সারাক্ষণ মরার কথা বলে।

রেসমার কথা শুনে ছেলের বাড়ীর লোক আর ছেলে দিয়াকে দেখতে আসে। তারা দিয়াকে দেখে পছন্দ করে। বিয়ের কথা ঠিক ঠাক করে যায়। মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে বলে রিতার মাথা থেকে অনেক চিন্তা দূর হয়। ডাক্তারের নিষেধ থাকা স্বত্ত্বেও রিতা সেলাই মেশিনে সেলাই করে।

কেননা তাকে অনেক টাকা জোগাড় করতে হবে। এজন্য বেশি বেশি রিতা কাজ করে। একদিন মেশিন চালাতে চালাতে রিতা অজ্ঞান হয়ে যায়। তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। ডাক্তার চেকাপ করে বলে, বেশি বেশি কাজ করার কারনে আর নিজের প্রতি যত্ন না নেয়ার ফলে রিতার হার্ট এট্যাক হয়েছে। আর এ কারনে রিতা মারা যায়। রিতা আর নেই।

এ কথা শুনে দিয়ার মাথায় যেন কষ্টের পাহাড় ভেঙ্গে পড়লো। যেন তার শরীরে কোন অঙ্গ তার থেকে আলাদা হয়ে গেছে। সে কাদতে কাদতে তার মাকে ডাকতে থাকে। কিছু দিন পর আমার বিয়ে আমাকে বিয়ে দিবে না মা? কার ভরসায় আমি যাবো মা। তুমি কথা বলো মা। উঠো মা উঠো এভাবে দিয়া কাদতে থাকে। এসময় কেউ একজন তার মাথায় হাত রাখে। সেটা অন্য কেউ না সে ছিলো তার বাবা সুজন।

সে তার বাবাকে বলে দেখো বাবা মা আর কথা বলছে না আমার সাথে। মা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। সুজন তার ভুল বুঝতে পেরে বলে, রিতা আমাকে মাফ করে দাও আমার মদ ও জুয়ার নেশার কারনে তোমাকে অভাব অনটনে দিন কাটাতে হয়েছে। আমার জন্যই তোমাকে আজকে এই দুনিয়া ছেরে যেতে হয়েছে।

তুমি টাকা রোজগার করতে আর আমি তা মদ জুয়ায় উড়াতাম। আজকে আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি আমি আর মদ খাবো না। দিয়া মা তুই কাদিস না। পারলে তোর বাবাকে ক্ষমা করে দে। আমার জন্যই এমনটা হয়েছে। সুজন তার ভুল বুঝতে পেরেছে। রিতার উপর যা অন্যায় করেছে তা মনে করে সে কাদতে থাকে।

রেসমা এসময় বাড়িতে আসে। রিতার মৃত্যুর কথা শুনে সে ছুটে চলে আসে। সে সুজনকে তার মেয়ের বিয়ে দেওয়ার কথা জানায়। আরো জানায় যে দিয়ার বিয়েই রিতার শেষ ইচ্ছা ছিল। তার মেয়ের বিয়ে আর সেটা যেন অপূর্ণ না থাকে। সুজন ছেলে পক্ষকে বিয়ের দিন তারিখ বলে দেয়। কিন্তু সে চিন্তায় পড়ে যায়। সে চিন্তা করে কিভাবে সে মেয়ের বিয়ে দিবে এবং আয়োজন করবে। কারন সে আগে সব টাকা মদ আর জুয়ায় শেষ করে ফেলেছে।

এই সময় দিয়া তার বাবার সামনে আসে। তার হাতে ছিল তার মায়ের সেই মাটির ব্যাংক। যেখানে রিতা প্রতিদিন কিছু টাকা জমাতো দিয়ার বিয়ের জন্য। দিয়া মাটির ব্যাংকটি তার বাবার কাছে দিল আর বললো এই নাও মায়ের মাটির ব্যাংক। কিছু দিন আগে মা আমাকে এটা আমার কাছে রাখতে দেয়। আর বলেছিল এটা যেন আমি আমার বিয়ের আগে ব্যাংকটি ভাঙ্গি।

সুজন বলে, মাটির ব্যাংক! এটা যদি তোর মায়ের ইচ্ছে হয় তাহলে দিয়া তুই এটা নিজের হাত এ ভেঙ্গে ফেল। মায়ের কথা রাখতে দিয়া নিজের হাত এ মাটির ব্যাংক টা ভেঙ্গে ফেলে। সেখানে অনেক টাকা ছিল আর একটা চিঠি ছিল। চিঠিতে লেখা ছিল, আমার মেয়ে বিয়ে দেওয়ার জন্য। এটা দেখে সুজন জোরে জোরে কাদতে থাকে।

এরপর সুজন রিতার জমানো টাকা দিয়ে দিয়ার বিয়ের আয়োজন করে। বিয়ে হয়ে যায় আর দিয়াও তার মায়ের আশির্বাদ  নিয়ে শশুর বাড়ি চলে যায়।